রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স টানা পাঁচ বছর লাভের ধারায় থাকার কথা জানালেও সংস্থাটির কাছে সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের বকেয়া পাওনা রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং পদ্মা অয়েল পিএলসির হিসাব অনুযায়ী, দুই প্রতিষ্ঠানের পাওনাই ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বেবিচকের অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ এবং সারচার্জ বাবদ বিমানের কাছে পাওনা রয়েছে ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা। অন্যদিকে পদ্মা অয়েলের জ্বালানি বাবদ বর্তমান বকেয়া ১ হাজার ২৩২ কোটি ৭১ লাখ ১৬ হাজার ৩৮২ টাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই দুই অঙ্কই উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি হিসাবগত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই অঙ্ক যোগ করলে মোট হয় প্রায় ৭ হাজার ৭৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা, ৭ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা নয়। ফলে প্রকাশের আগে মূল উৎসে মোট বকেয়ার অঙ্কটি পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।
পদ্মা অয়েলের হিসাবে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ বাবদ বিমানের বকেয়া হয়েছিল ২ হাজার ১০৮ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে বিমান ৮৭৫ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার ৮৯২ টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে বকেয়া রয়েছে ১ হাজার ২৩২ কোটি ৭১ লাখ টাকার বেশি।
বকেয়া পরিশোধ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তের পর বিমান প্রতি মাসে পদ্মা অয়েলকে অন্তত ২৫ কোটি টাকা করে পরিশোধ করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই হিসাবে নতুন কোনো বকেয়া বা অন্যান্য সমন্বয় না ধরলে বর্তমান ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা পরিশোধ করতে মাসে ২৫ কোটি টাকা হারে চার বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে প্রকৃত সময় নির্ভর করবে নতুন জ্বালানি বিল, চলতি পরিশোধ, সুদ বা অন্যান্য আর্থিক সমন্বয়ের ওপর।
বিমানের কাছে সবচেয়ে বড় অঙ্কের পাওনা বেবিচকের। বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন aeronautical এবং non-aeronautical charge ও surcharge মিলিয়ে পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।
এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে aeronautical charges-এর মধ্যে সাধারণত landing, parking, navigation বা সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর ও উড্ডয়নসেবা-ভিত্তিক চার্জ থাকতে পারে। Non-aeronautical dues আবার জায়গা বা অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা ব্যবহারের মতো খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে বিমানের এই নির্দিষ্ট বকেয়ার খাতভিত্তিক পূর্ণ বিভাজন প্রকাশিত তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়।
বেবিচক বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে বিমানকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিমানের আর্থিক অবস্থার ক্ষেত্রে লাভ এবং পুরোনো বকেয়া—দুটি আলাদা হিসাব হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমান ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। একই অর্থবছরে সংস্থাটির operating profit ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা এবং মোট revenue ছিল ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। এটি ছিল বিমানের টানা পঞ্চম লাভজনক বছর।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি অর্থবছরের net profit থাকলেই তার আগের accumulated liability বা payable স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধ হয়ে যায় না। বকেয়া যদি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে, তাহলে বর্তমান মুনাফার পাশাপাশি পুরোনো দায় পরিশোধের জন্য আলাদা cash-flow এবং repayment পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়।
তাই বিমানের ৭৮৫ কোটি টাকার মুনাফা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার কোটি টাকার পাওনা পরস্পরবিরোধী তথ্য নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বকেয়া কীভাবে কমানো হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বকেয়া নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বিমান বড় ধরনের fleet modernization কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রেও আপনার দেওয়া তথ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হালনাগাদ প্রয়োজন।
বিমান এখন শুধু ১১টি বোয়িং কেনার ‘পরিকল্পনা’ পর্যায়ে নেই। ২০২৬ সালে দুই দফায় মোট ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়া হয়েছে।
প্রথম চুক্তিতে রয়েছে ১৪টি উড়োজাহাজ—৮টি Boeing 787-10, ২টি Boeing 787-9 এবং ৪টি Boeing 737-8। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর আরও ৫টি 787-10 এবং ৬টি 737-8, অর্থাৎ ১১টি উড়োজাহাজের অর্ডার ঘোষণা করে Boeing ও Biman। ফলে ২০২৬ সালে Boeing-এর কাছে বিমানের মোট order book দাঁড়িয়েছে ২৫টি উড়োজাহাজে।
Boeing-এর মতে, নতুন 737-8 ও 787 পরিবারের উড়োজাহাজগুলো বহর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে।
এ কারণে আগের “১১টি Boeing ও ১০টি Airbus মিলে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ” পরিকল্পনাকে বর্তমান অবস্থার বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করলে সংবাদটি outdated হয়ে যাবে। Airbus নিয়ে আলোচনা বা ভবিষ্যৎ procurement আলাদা বিষয় হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত Boeing order এখন ২৫টি।
নতুন উড়োজাহাজ একটি এয়ারলাইন্সকে শুধু বেশি যাত্রী পরিবহনের সুযোগ দেয় না। এর সঙ্গে pilot ও cabin crew, engineering support, maintenance, spare parts, ground handling, financing এবং নতুন route-এর commercial viability-ও জড়িত।
Biman বর্তমানে Boeing 777, 787 ও 737 পরিবারের উড়োজাহাজ পরিচালনা করায় নতুন Boeing fleet-এর ক্ষেত্রে existing operational experience কাজে লাগতে পারে। Boeing-ও জানিয়েছে, 737-8 ও 787-10 যুক্ত হওয়া বর্তমান Boeing fleet-এর সঙ্গে commonality বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
তবে বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি পুরোনো সরকারি বকেয়া ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ aircraft acquisition-এর অর্থায়ন, নতুন route পরিচালনা এবং existing liabilities—সবকিছু শেষ পর্যন্ত এয়ারলাইন্সের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দেশের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে সংস্থাটি।
টানা পাঁচ বছরের মুনাফা এবং বড় fleet expansion বিমানের জন্য ইতিবাচক আর্থিক ও পরিচালন সূচক হলেও, একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার পুরোনো পাওনা পরিশোধের একটি টেকসই পরিকল্পনা সংস্থাটির আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকছে।
তথ্যসূত্র: বেবিচক ও পদ্মা অয়েল।
মন্তব্য করুন