চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান যাত্রী ও বিমান চলাচলের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে ‘Expansion of Chattogram Shah Amanat International Airport (Design Phase)’ প্রকল্পের আওতায় এসব পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের জন্য ২০৭০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এর ভিত্তি হিসেবে যাত্রী, কার্গো, জেনারেল এভিয়েশন ও সামরিক উড়োজাহাজের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর বিস্তারিত ট্রাফিক পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যানে বিমানবন্দরের উন্নয়নকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায় DP1, যার লক্ষ্য ২০৩০ সাল এবং ডিজাইন ক্যাপাসিটি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায় DP2, যার লক্ষ্য ২০৪০ সাল এবং ডিজাইন ক্যাপাসিটি ২০৪৫ সাল পর্যন্ত। আর তৃতীয় ধাপকে Development Phase Vision (DPV) হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২০৭০ সাল।
পরিকল্পনায় বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে নতুন অবকাঠামো যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নতুন একটি ডোমেস্টিক টার্মিনাল নির্মাণ। একই সঙ্গে বিদ্যমান যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও পুনর্বিন্যাস করে সেটিকে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবার জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজাইন পর্যায়ের প্রথম ধাপে বিদ্যমান টার্মিনালের মোট গ্রস ফ্লোর এরিয়া প্রায় ২৭ হাজার ১০৫ বর্গমিটার। এর সঙ্গে আরও প্রায় ১২ হাজার ৭৫ বর্গমিটার সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে DP1 পর্যায়ে আন্তর্জাতিক টার্মিনালের মোট এলাকা দাঁড়াবে প্রায় ৩৯ হাজার ১৮০ বর্গমিটার।
অন্যদিকে নতুন ডোমেস্টিক টার্মিনালের মোট গ্রস ফ্লোর এরিয়া প্রস্তাব করা হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ১২৫ বর্গমিটার। নকশায় টার্মিনালের বিভিন্ন তলায় যাত্রীসেবা, অফিস, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধার জন্য জায়গা রাখা হয়েছে।
প্রেজেন্টেশনে নতুন ডোমেস্টিক টার্মিনালকে Terminal B এবং সম্প্রসারিত বিদ্যমান আন্তর্জাতিক টার্মিনালকে International Terminal A হিসেবে দেখানো হয়েছে। টার্মিনাল দুটির সংযোগ ও যাত্রী চলাচলের জন্য পৃথক প্রবাহও নকশায় তুলে ধরা হয়েছে।
বিমানবন্দরের রানওয়ের সক্ষমতা বাড়াতেও বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার। মাস্টারপ্ল্যানে এটিকে প্রথম পর্যায়ে ৩ হাজার ৩০০ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণের পাশাপাশি সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে, র্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে, আইসোলেটেড পার্কিং এবং শোল্ডারসহ প্রয়োজনীয় এয়ারফিল্ড অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন ভবিষ্যতে বিমান চলাচলের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বড় ধরনের অপারেশনাল সক্ষমতা তৈরিতে সহায়ক হবে বলে পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু যাত্রীসেবা নয়, বিমানবন্দরের কার্গো কার্যক্রমকেও ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় নতুন ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কার্গো টার্মিনাল ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যমান কার্গো টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন ও বিদ্যমান কার্গো টার্মিনালের জন্য আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অপারেশন সুবিধা স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাফিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে শাহ আমানত বিমানবন্দরে বেস কেস হিসেবে বছরে প্রায় ১০ হাজার ৫৪৭ টন এয়ার কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে। ২০৪০ সালে তা বেড়ে প্রায় ২২ হাজার ৭৯৬ টন এবং ২০৪৫ সালে প্রায় ২৬ হাজার ৫৫ টনে পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৭০ সালে বেস কেসে কার্গো হ্যান্ডলিং প্রায় ৫০ হাজার ৮৩৪ টনে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আশাবাদী পরিস্থিতিতে এই পরিমাণ ২০৭০ সালে প্রায় ৫৫ হাজার ৭৬১ টন হতে পারে।
বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদার ওপরও বিস্তৃত পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। বেস কেস অনুযায়ী ২০৩০ সালে বছরে প্রায় ২২ লাখ ৭৪ হাজার যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করতে পারেন। ২০৪০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩৬ লাখ ৬০ হাজার এবং ২০৪৫ সালে প্রায় ৪৪ লাখ ২০ হাজার হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ২০৭০ সালে বেস কেসে বার্ষিক যাত্রী সংখ্যা প্রায় ৮৯ লাখ ধরা হয়েছে। তবে আশাবাদী পরিস্থিতিতে এই সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি হতে পারে। বিপরীতে, অপেক্ষাকৃত কম প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে ২০৭০ সালে যাত্রী সংখ্যা প্রায় ৫৭ লাখ ৭১ হাজার হতে পারে।
অর্থাৎ, আগামী কয়েক দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিমান চলাচলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে—এমন বিবেচনা থেকেই দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
প্রেজেন্টেশনে ২০৩০, ২০৪০ এবং ২০৭০ সালের জন্য বিমানবন্দরের পৃথক লেআউট দেখানো হয়েছে। এতে ধাপে ধাপে টার্মিনাল, পার্কিং, এয়ারফিল্ড, কার্গো ও অন্যান্য অবকাঠামোর সম্প্রসারণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
২০৭০ সালের ভিশন লেআউটে বিমানবন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য আরও বিস্তৃত ভূমি ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাতেও বিমানবন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় এলাকা সংরক্ষণ ও যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।
বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় শুধু টার্মিনাল বা রানওয়ে নয়, প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় ইনটেক পাওয়ার প্ল্যান্ট ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা, এয়ারফিল্ড লাইটিং সিস্টেম, ড্রেনেজ ও কালভার্ট, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও কার পার্ক নির্মাণের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া বিমান চলাচল-সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ও কমিউনিকেশন সরঞ্জাম স্থাপন এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা তৈরির বিষয়ও প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে।
বিমানবন্দর পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে একটি Emergency Operations Centre (EOC) নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ ধরনের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ ও ব্যবহার পরিকল্পনা, সীমানাপ্রাচীর, ল্যান্ডস্কেপিং, সৌন্দর্যবর্ধন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অবকাঠামোও মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শাহ আমানত বিমানবন্দর সম্প্রসারণের নকশা পর্যায়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় ১৮ আগস্ট ২০২০। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ৩৭৮২.৬৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে Airport Consulting Partners GmbH Beratende Ingenieure।
প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হয় ৮ জুন ২০২৩। প্রেজেন্টেশনে দেওয়া সর্বশেষ অগ্রগতি অনুযায়ী প্রকল্পটির সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৮২.৭৮ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতিও একই অনুপাতে দেখানো হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে Environmental Impact Assessment, Detailed Feasibility Study, Survey Work, Airport Master Plan, Soil Investigation এবং Preliminary Design।
অন্যদিকে এখনো বাকি রয়েছে Detailed Design, Tender Document ও Development Project Proposal (DPP) প্রস্তুত এবং Transfer of Technology-এর কাজ।
পরিকল্পনায় শাহ আমানত বিমানবন্দরকে শুধু বর্তমান চাহিদা পূরণের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি সক্ষম ও আধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন ডোমেস্টিক টার্মিনাল, সম্প্রসারিত আন্তর্জাতিক টার্মিনাল, দীর্ঘ রানওয়ে, আধুনিক কার্গো সুবিধা, উন্নত ট্যাক্সিওয়ে, পার্কিং, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ধাপে ধাপে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৭০ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্রমবর্ধমান যাত্রী, কার্গো ও বিমান চলাচলের চাহিদা মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন