বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট কিছু সংস্করণের ফ্লাইট কম্পিউটার সফটওয়্যারে একটি ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে, যার কারণে অবতরণের একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে পাইলটরা স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট গাইডেন্স সুবিধা হারাতে পারেন। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) পর্যালোচনা করছে এবং স্থায়ী সমাধানে নতুন সফটওয়্যার আপডেট তৈরির কাজ করছে বোয়িং।
কোম্পানির নথিপত্রের বরাত দিয়ে প্রথমে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বিষয়টি প্রকাশ করে। পরে বোয়িংও সফটওয়্যার সমস্যাটির বিষয় নিশ্চিত করেছে।
সমস্যাটি মূলত একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেখা দিতে পারে। কোনো উড়োজাহাজের প্রথম অবতরণ প্রচেষ্টা সফল না হলে বা ‘মিসড অ্যাপ্রোচ’-এর পর পাইলটরা পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইটপথ পরিবর্তন করলে ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট কম্পিউটারের সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট গাইডেন্সের একটি অংশ প্রত্যাশিতভাবে কাজ না-ও করতে পারে।
এতে উড়োজাহাজের ভার্টিক্যাল নেভিগেশন বা VNAV ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে অপেক্ষাকৃত সাধারণ স্বয়ংক্রিয় পিচ কন্ট্রোল মোডে চলে যেতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাইলটদের বিদ্যমান প্রশিক্ষণ ও পদ্ধতি রয়েছে বলে জানিয়েছে বোয়িং।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, গত আগস্টেই ৭৩৭ অপারেটরদের সফটওয়্যার সমস্যাটি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি নিরাপদে মোকাবিলায় বিদ্যমান পাইলট পদ্ধতিগুলো পুনরায় তুলে ধরা হয়েছে।
বোয়িং বলছে, সমস্যাটি স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য প্রকৌশলীরা একটি সফটওয়্যার আপডেট তৈরির কাজ করছেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন সুবিধা পুনরায় চালু করার একটি পদ্ধতি নিয়েও এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে কাজ করছে উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের ফ্লাইট কম্পিউটার সফটওয়্যার আপডেটে সম্ভাব্য সমস্যাটির বিষয়ে তারা অবগত এবং বোয়িং ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।
এফএএ বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি Corrective Action Review Board (CARB) গঠন করবে। পর্যালোচনায় কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগ শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
তবে এই সফটওয়্যার ত্রুটির অর্থ এই নয় যে ৭৩৭ ম্যাক্সের স্বাভাবিক প্রতিটি অবতরণে সমস্যা দেখা দেবে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিসড অ্যাপ্রোচের পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফ্লাইটপথ পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট গাইডেন্স ব্যবহারের সময় সমস্যাটি দেখা দিতে পারে। ফলে ত্রুটিটির কার্যকর পরিধি বোঝার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস ও ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ত্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যার সংস্করণ থাকা নতুন ৭৩৭ ম্যাক্স গ্রহণ না করার কথা বোয়িংকে জানিয়েছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তারা নতুন উড়োজাহাজে আগের সফটওয়্যার সংস্করণ ব্যবহারের অনুরোধ করেছে।
অন্যদিকে CBS News-কে আলাস্কা এয়ারলাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনস, সাউথওয়েস্ট ও ইউনাইটেড জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের পরিচালনাধীন ৭৩৭ ম্যাক্স বহরে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে না।
ঠিক কতটি ৭৩৭ ম্যাক্স বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ফলে যাত্রীদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো এয়ারলাইন বা ফ্লাইটকে এই সফটওয়্যার সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বোয়িংয়ের পরবর্তী পর্যালোচনা এবং সফটওয়্যার আপডেটের অগ্রগতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
৭৩৭ ম্যাক্স বোয়িংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ন্যারো-বডি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ পরিবার। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর মডেলটি দীর্ঘ সময় বিশ্বব্যাপী গ্রাউন্ডেড ছিল। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের পর এটি পুনরায় বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ফিরে আসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজের উৎপাদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রক নজরদারিও বেড়েছে। বর্তমান সফটওয়্যার সমস্যাটির ক্ষেত্রে এফএএ এখন পর্যালোচনা করে দেখবে অতিরিক্ত কোনো নিরাপত্তামূলক বা সংশোধনী ব্যবস্থা প্রয়োজন কি না।
তথ্যসূত্র: Reuters, The Wall Street Journal, FAA ও Boeing
মন্তব্য করুন