এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফার নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল, আকাশপথে বিধিনিষেধ এবং বিকল্প রুটে যাতায়াতের কারণে যাত্রীদের ভ্রমণের সময় ও ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে পরিচালিত প্রায় ২০ শতাংশ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেও তেহরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে সরাসরি যেতে তিন ঘণ্টার কম সময় লাগত। তখন টিকিটের মূল্য ছিল ১০০ থেকে ২০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে একই গন্তব্যে পৌঁছাতে এখন ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। টিকিটের দামও বেড়ে এক হাজার ডলার ছাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিমান সংস্থা এবং তাদের সেবা প্রদানকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইরানি এয়ারলাইন্সগুলোকে সেবা বন্ধ করার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়।
এর ফলে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি আজারবাইজান, জর্জিয়া, ওমান, ইরাক ও তুরস্কের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট চলাচলও ব্যাহত হয়।
গত আগস্টে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করে ওয়াশিংটন। এর আওতায় ইরানে চলাচলকারী ২৭টি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
একই সঙ্গে ইরানি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়। এসব বিধিনিষেধের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত ২৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন তেহরান থেকে তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেগামী একটি ইরানি উড়োজাহাজকে মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে হয়। তুর্কমেনিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় ফ্লাইটটি তেহরানে ফিরে যায়।
এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত, আজারবাইজান ও জর্জিয়াও ইরানি ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ইরান থেকে ওমানের মাসকাট ও ইরাকের বাগদাদগামী ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। তুরস্কগামী কয়েকটি ফ্লাইট বাতিলের পাশাপাশি ইরাকের নাজাফগামী বিমান চলাচলও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও আর্মেনিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইরানের সীমিত বিমান যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মস্কো, ইস্তাম্বুল, নাজাফ, ইয়েরেভান ও গুয়াংজুর মতো গন্তব্যে কিছু ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
ইরানের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন টিকিট ও আবাসন বুকিং প্ল্যাটফর্ম আলিবাবা ট্রাভেল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মাজিদ হোসেইনি-নেজাদ আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান থেকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে পরিচালিত প্রায় ২০ শতাংশ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে।
ফ্লাইট কমে যাওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর পাশাপাশি টিকিট বুকিং ও ভ্রমণসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এদিকে গত ১১ অক্টোবর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদেশি গন্তব্যে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট চলাচল সহজ করতে দেশটির অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ কাজ করছে।
বিমান যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসা, ব্যবসা ও পারিবারিক প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী যাত্রীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারী ৪৩ বছর বয়সী এক ইরানি নাগরিক আল-জাজিরাকে জানান, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য ইরানে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এখন ইরানে যেতে হলে প্রথমে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছাতে হচ্ছে। সেখান থেকে ইরানগামী ফ্লাইট পেতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশ থেকে ইরানি বিমান সংস্থার টিকিট সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন ইরান ও ওমানের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতকারী আরেক ইরানি নাগরিক। তাঁর মতে, তেহরান–মাসকাট রুটে যাতায়াতের সময় ও খরচ আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কারণে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ আগে থেকেই সীমিত ছিল। এর মধ্যে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিমান পরিবহন খাতকে আরও সংকটে ফেলেছে।
পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটগুলো কবে পুনরায় চালু হবে কিংবা যাত্রীদের অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয় কত দিন বহন করতে হবে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো সময়সীমা পাওয়া যায়নি।
সূত্র: আল-জাজিরা।
মন্তব্য করুন