হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চারটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে আটকে আছে। অধিকাংশ বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রাজস্ব ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা এবং ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে চারটি শর্তে সমঝোতা না হওয়ায় বিষয়টি এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে বিমান মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সার্বিক দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করতে হবে। অর্থাৎ থার্ড টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিদেশি অংশীদারদের হাতে থাকলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের দায়ভার থাকবে বিমানের ওপর।
এ ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে বিমান কীভাবে আয় পাবে, সে বিষয়েও সরকারের নিশ্চয়তা চেয়েছে জাপানি পক্ষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার কার্যক্রম ও আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব ভাগাভাগি। পূর্বনির্ধারিত চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী বিদেশি পক্ষের কাছ থেকে বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা ছিল।
তবে অপারেশনাল প্রস্তুতি বা OPCT-এর আট মাসের সময়কালের জন্য জাপানি পক্ষ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এতে নির্ধারিত হারের তুলনায় বাংলাদেশের প্রাপ্য রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তৃতীয় শর্তটি দেশের আইন প্রয়োগ ও আইনি সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। জাপানি পক্ষ বিশেষ আইনি সুবিধা, সুরক্ষা বা দায়মুক্তির দাবি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান হলো, সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন করলে কিংবা বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করলে তা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেশের সাধারণ আইনের বাইরে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সম্মত নয়।
জাপানি পক্ষ অবশ্য সাধারণ কোনো আইনি পরিবর্তন তাদের ওপর প্রয়োগ না করার নিশ্চয়তা চাচ্ছে। এ কারণে বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
চতুর্থ বিরোধটি থার্ড টার্মিনালের নির্মাণগত বা কারিগরি ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা নিয়ে। একে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (DLP) বলা হয়।
বাংলাদেশ এই সময়সীমা নয় মাস রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে জাপানি পক্ষ তা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবি জানিয়েছে। ফলে ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর দায়িত্ব ও সংশোধন কার্যক্রমের সময়সীমা নিয়েও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান মনে করেন, বিষয়গুলো দেশের স্বার্থ ও সম্ভাব্য আর্থিক আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় চুক্তির আগে এগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
তার মতে, আলোচনার শুরু থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা না রাখায় একটি পক্ষের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। এতে চুক্তির বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন শর্ত উত্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই চুক্তি করার আগে আর্থিক দায়, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, আইনি সুরক্ষা এবং যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতির দায়দায়িত্বসহ প্রতিটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থ বিবেচনায় চুক্তির শর্তগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা উচিত। ভবিষ্যতে নতুন কোনো দাবি যাতে চুক্তির ওপর চাপ তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা দরকার।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আলোচনা শেষ হয়েছে। তবে চারটি নতুন শর্ত এসেছে, যেগুলো বেবিচকের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, বিষয়টি জানিয়ে বিমান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত বা সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে।
তার আশা, দ্রুতই চুক্তির প্রক্রিয়া শেষ হবে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হবে।
থার্ড টার্মিনালের পরিচালন চুক্তি বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় এবং যাত্রীসেবার ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই চুক্তির অমীমাংসিত চারটি শর্তে সমঝোতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ নিশ্চিত করাকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোর্স: বেবিচক
মন্তব্য করুন