এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছিল, প্রকল্পের অর্থ ব্যয় অনুমোদিত প্রক্রিয়া ও চুক্তির শর্ত অনুসরণ করেই করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের যে অভিযোগ সামনে এসেছিল, সেটিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অনিয়ম নয়, বরং নিরীক্ষা আপত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল সংস্থাটি।
তবে জুলাইয়ে বেবিচকের ওই ব্যাখ্যার পর প্রকল্পের আর্থিক কাঠামোয় নতুন পরিবর্তন এসেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতে আরও প্রায় ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এতে শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয় বেড়ে প্রায় ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
একই সময়ে থার্ড টার্মিনালকে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আনার প্রস্তুতিও চলছে। সর্বশেষ সরকারি ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬ টার্মিনালটি সীমিত পরিসরে চালু করে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০টি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
থার্ড টার্মিনালসহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা DPP ২০১৭ সালে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়েছিল।
পরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর সর্বনিম্ন বৈধ দরদাতার প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সংশোধিত DPP-তে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা করা হয়।
অর্থাৎ মূল DPP থেকে প্রথম সংশোধনেই প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বেবিচকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অনুমোদনহীন ব্যয় ছিল না; আন্তর্জাতিক দরপত্রে পাওয়া দর এবং নির্ধারিত সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে প্রকল্পে প্রয়োজনীয় variation work অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এসব variation work-এর জন্য প্রায় ৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কাজের বিভিন্ন item-এর বাস্তব পরিমাণ সমন্বয় করে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা কমানো হয়। এর ফলে দ্বিতীয় সংশোধিত DPP-তে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সংশোধিত DPP অনুমোদন করা হয়।
জুলাইয়ে বেবিচক যখন প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দেয়, তখন সংস্থাটি জানিয়েছিল, প্রকল্পে ইতোমধ্যে ২০ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং সেটি তৎকালীন অনুমোদিত ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার সীমার মধ্যেই ছিল।
তবে এটি জুলাইয়ের হিসাব। পরবর্তীতে প্রকল্পের ব্যয় আবার সংশোধিত হওয়ায় বর্তমানে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা আর সর্বশেষ অনুমোদিত মোট প্রকল্প ব্যয় নয়।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোয় আবার পরিবর্তন এসেছে।
তৃতীয় সংশোধনীতে প্রায় ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা নতুন করে যুক্ত হওয়ায় মোট প্রকল্প ব্যয় বেড়ে প্রায় ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন প্রায় ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা এবং জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা JICA-এর ঋণ প্রায় ১৭ হাজার ৯৭ কোটি টাকা।
ফলে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বর্তমান কোনো প্রতিবেদনে তিনটি আলাদা সময়ের অঙ্ককে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না—
মূল DPP ছিল প্রায় ১৩,৬১০ কোটি টাকা।
প্রথম সংশোধিত DPP ছিল প্রায় ২১,৩৯৯ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় সংশোধিত DPP ছিল প্রায় ২১,৩৬৫ কোটি টাকা।
আর সর্বশেষ তৃতীয় সংশোধনীর পর প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২,২১৩ কোটি টাকা।
থার্ড টার্মিনাল নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।
এ বিষয়ে বেবিচকের বক্তব্য ছিল, এই অঙ্ককে প্রমাণিত দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। এটি Foreign Aided Projects Audit Directorate-এর উত্থাপিত audit objection-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
Audit objection এবং চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত আর্থিক অনিয়ম এক বিষয় নয়।
নিরীক্ষায় কোনো ব্যয়, নথি বা প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তার জবাব দিতে হয়। জবাব, supporting documents এবং পরবর্তী নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে আপত্তি নিষ্পত্তি হতে পারে অথবা বহাল থাকতে পারে।
বেবিচক জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট আপত্তিগুলোর জবাব ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছিল।
অন্যদিকে একই সময়ে সরকার অভিযোগগুলো তদন্তের কথাও জানিয়েছিল। ফলে বেবিচকের বক্তব্যকে সংস্থাটির নিজস্ব ব্যাখ্যা হিসেবেই উপস্থাপন করা যথাযথ; স্বাধীন তদন্ত বা নিরীক্ষা নিষ্পত্তির আগেই অভিযোগগুলোকে চূড়ান্তভাবে সত্য বা মিথ্যা বলা উচিত নয়।
থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের landscaping, পুকুর উন্নয়ন, মাটি অপসারণ এবং বিভিন্ন construction item-এর ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
বেবিচকের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পের চুক্তিতে মোট ১৪ হাজার ৮২৪টি item অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন item-এর মূল্যকে সম্পূর্ণ কাজের scope থেকে আলাদা করে উপস্থাপন করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
সংস্থাটি দাবি করেছিল, landscaping ও অন্যান্য কাজের অর্থ সংশ্লিষ্ট contractual scope এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই ব্যয় করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি বেবিচকের ব্যাখ্যা। যেসব ব্যয় নিয়ে audit objection বা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা রয়েছে, সেগুলোর চূড়ান্ত অবস্থান সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা বা তদন্ত প্রক্রিয়ার ফলের ওপর নির্ভর করবে।
বড় infrastructure project-এ মূল construction চলাকালে বাস্তব পরিস্থিতির কারণে কিছু কাজের পরিমাণ বা scope পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। Contract management-এ এগুলো variation হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকার variation work দ্বিতীয় সংশোধিত DPP-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
বেবিচক জানিয়েছিল, JICA-এর loan agreement guideline এবং contractor-এর সঙ্গে সম্পাদিত FIDIC Conditions of Contract অনুসারে প্রকল্পের Engineer হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক consultant NOCD JV variation work-এর instruction ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে।
সংস্থাটির দাবি ছিল, সেই contractual process অনুসরণ করেই variation work-এর মূল্য অনুমোদিত হয়েছে।
তবে variation অনুমোদিত হওয়া এবং প্রতিটি expenditure-এর value-for-money বা audit assessment একই প্রশ্ন নয়। পরবর্তী নিরীক্ষা ও পর্যালোচনায় এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা আলাদাভাবেও যাচাই হতে পারে।
প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে contractor-কে additional payment দেওয়ার বিষয় নিয়েও সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
বেবিচক সেই অভিযোগের জবাবে জানিয়েছিল, COVID-19 pandemic-সহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে construction progress ধরে রাখতে contractual provision অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি দাবি করে, সংশ্লিষ্ট payment-ও অনুমোদিত contract framework-এর মধ্যেই হয়েছে।
বড় infrastructure project-এ acceleration cost থাকতে পারে, তবে এ ধরনের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট contract clause, approval, কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং audit verification-এর ওপর।
থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন এসেছে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা JICA-এর ঋণ থেকে।
সর্বশেষ সংশোধিত ব্যয় কাঠামো অনুযায়ী, প্রায় ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রায় ১৭ হাজার ৯৭ কোটি টাকা JICA financing এবং প্রায় ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন রয়েছে।
এ ধরনের foreign-assisted project-এ বাংলাদেশের নিজস্ব সরকারি approval process-এর পাশাপাশি development partner-এর procurement ও loan-related requirement-ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফলে প্রকল্পটির financial governance বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু মোট ব্যয়ের অঙ্ক নয়; procurement, contract variation, consultant approval, audit objection এবং settlement process—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
থার্ড টার্মিনাল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর soft opening হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ commercial operation শুরু হয়নি।
সর্বশেষ ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬ টার্মিনালটি আংশিকভাবে operational করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০টি flight নতুন terminal থেকে পরিচালনা করার কথা বলা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে operational readiness অনুযায়ী ধাপে ধাপে flight সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন, terminal-এর বিভিন্ন equipment integration এবং operation-সংক্রান্ত PPP arrangement-এর বাকি বিষয়গুলো সমাধানে কাজ চলছে।
ফলে ‘ডিসেম্বরে থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হচ্ছে’ বলার চেয়ে ‘১৬ ডিসেম্বর সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য’ বলা বর্তমান তথ্য অনুযায়ী অধিক নির্ভুল।
একটি airport terminal নির্মাণ শেষ হওয়া এবং সেটিকে commercial operation-এর জন্য প্রস্তুত করা একই বিষয় নয়।
Passenger processing system, baggage handling, security screening, boarding bridge, airline system, customs-immigration facilities, ground handling এবং অন্যান্য equipment ও agency operation-এর মধ্যে integration প্রয়োজন হয়।
এ কারণেই ২০২৩ সালে soft opening হলেও থার্ড টার্মিনাল সঙ্গে সঙ্গে commercial operation-এ যেতে পারেনি।
বর্তমানে equipment integration এবং operational arrangement চূড়ান্ত করার কাজ চলার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
থার্ড টার্মিনালের ব্যয় নিয়ে চলমান আলোচনায় অন্তত তিনটি বিষয় আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমত, অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয় কত—সর্বশেষ সংশোধনের পর যা প্রায় ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা।
দ্বিতীয়ত, কোনো নির্দিষ্ট expenditure অনুমোদিত contractual process অনুসরণ করেছে কি না—এ বিষয়ে বেবিচক বলছে নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, audit objection বা দুর্নীতির অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কী—এটি সংশ্লিষ্ট audit, investigation ও settlement process-এর বিষয়।
একটি বিষয় দিয়ে অন্যটির উত্তর দেওয়া যায় না।
অনুমোদিত budget-এর মধ্যে expenditure থাকা মানেই প্রতিটি audit objection স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। আবার audit objection ওঠাও নিজে থেকে প্রমাণিত দুর্নীতির সমান নয়।
এই পার্থক্য বজায় রেখেই থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের আর্থিক বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বর্তমানে শাহজালালের থার্ড টার্মিনালকে ঘিরে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে প্রকল্পের সর্বশেষ সংশোধিত ব্যয় ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা এবং পূর্বে ওঠা audit objection ও আর্থিক অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি।
অন্যদিকে ১৬ ডিসেম্বর সীমিত commercial operation শুরু করার প্রস্তুতি।
দেশের সবচেয়ে বড় aviation infrastructure project-গুলোর একটি হওয়ায় এর ব্যয়, procurement, operational readiness এবং audit findings সম্পর্কে স্বচ্ছ ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে অভিযোগ, audit objection এবং প্রমাণিত অনিয়ম—এই তিনটিকে আলাদা করে উপস্থাপন করাও দায়িত্বশীল প্রতিবেদনের জন্য জরুরি।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ
মন্তব্য করুন