এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালে আগামী সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রীসেবা শুরু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর আগেই নতুন টার্মিনালটি বাস্তব অপারেশনে যুক্ত হচ্ছে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের মাধ্যমে। তার আগে রোববার পরিচালিত হবে চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বা ফাইনাল টেস্ট রান।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, রোববারের চূড়ান্ত টেস্ট রান সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর সোমবার থেকে নতুন টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ যাত্রীসেবা শুরু করা হবে।
প্রস্তুতি ও টেস্ট রান তদারক করতে এয়ার কমোডর মেহবুব খান এবং বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো. নূর-ই-আলম রোববার কক্সবাজার যাবেন। নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরুর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সোমবার পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন তারা।
প্রথম পর্যায়ে নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল থেকেই অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের আগমন ও বহির্গমন—দুই ধরনের যাত্রীসেবা পরিচালিত হবে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, কক্সবাজারে ফ্লাইট পরিচালনাকারী অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইন্সগুলো নতুন টার্মিনালে কার্যক্রম স্থানান্তরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে উড়োজাহাজ ও টার্মিনালের মধ্যে যাত্রী পরিবহনে গলফ কার্ট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ শেষ হওয়া এবং সেখানে বাস্তবে যাত্রীসেবা পরিচালনা করা দুটি ভিন্ন ধাপ। ফলে সোমবার থেকে যাত্রীসেবা শুরু হওয়াকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে রোববারের ফাইনাল টেস্ট রানে চেক-ইন, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা তল্লাশি, যাত্রী চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল ব্যবস্থাগুলো বাস্তব কার্যক্রমের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে।
প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালটি প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
টার্মিনালটিতে আধুনিক বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আগমন ও বহির্গমন সুবিধা, চেক-ইন ডেস্ক, ইমিগ্রেশন কাউন্টার, ব্যাগেজ ডেলিভারি বেল্ট, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর এবং নিরাপত্তা তল্লাশির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
নতুন অবকাঠামো পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে কক্সবাজার দেশের ব্যস্ততম অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর একটি। এখানে প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণ হয়ে থাকে।
ফলে নতুন টার্মিনাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিশেষ করে পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুমে যাত্রী ব্যবস্থাপনার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ভবিষ্যতে কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে পুরোনো ও নতুন টার্মিনালের ব্যবহারেও পরিবর্তন আসবে।
বেবিচকের সদস্য মেহবুব খান জানিয়েছেন, তখন বিমানবন্দরটিতে একটি হাইব্রিড টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর পর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কক্সবাজারে আসা যাত্রীরা বর্তমান পুরোনো টার্মিনাল ব্যবহার করবেন।
অন্যদিকে ঢাকা বা দেশের অন্য গন্তব্যে যাওয়া অভ্যন্তরীণ যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন সম্পন্ন করে বোর্ডিংয়ের জন্য পুরোনো টার্মিনালে যাবেন।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যাত্রীপ্রবাহ আলাদা রাখার পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের আরেকটি বড় অংশ হচ্ছে রানওয়ে সম্প্রসারণ।
আগের প্রায় ৯ হাজার ফুট রানওয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে সম্প্রসারণ করে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য সমুদ্র থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
দৈর্ঘ্যের হিসাবে এটি বর্তমানে বাংলাদেশের দীর্ঘতম রানওয়ে। ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার লক্ষ্য সামনে রেখেই রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ রানওয়ে ও আন্তর্জাতিক টার্মিনাল তৈরি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু হয় না।
এর জন্য কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, এভিয়েশন সিকিউরিটি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নেভিগেশন এবং রেসকিউ ও ফায়ার ফাইটিং সক্ষমতাসহ প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ও অপারেশনাল শর্ত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি কোনো এয়ারলাইনকে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক রুট বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সরকার আগামী অক্টোবরে কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কোন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে প্রথম ফ্লাইট যাবে, কোন এয়ারলাইন পরিচালনা করবে এবং নিয়মিত ফ্লাইট কবে শুরু হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
তার আগে নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ যাত্রীসেবা শুরু হওয়া বিমানবন্দরটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল মাইলফলক।
বাস্তব যাত্রী পরিচালনার মাধ্যমে টার্মিনালের চেক-ইন, নিরাপত্তা, ব্যাগেজ, যাত্রীপ্রবাহসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের সুযোগ পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতিতেও এই অভিজ্ঞতা কাজে আসতে পারে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য হওয়ায় বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বৃদ্ধি সরাসরি দেশের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত।
ভবিষ্যতে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা হয়ে অভ্যন্তরীণ সংযোগ নেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য বাজারের সঙ্গে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ তৈরি হলে কক্সবাজারের হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর এবং অন্যান্য পর্যটন ব্যবসায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সোমবার থেকে নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ যাত্রীসেবা শুরু তাই শুধু একটি নতুন ভবন ব্যবহারের সূচনা নয়; এটি কক্সবাজারকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির একটি বাস্তব ধাপ।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস
মন্তব্য করুন