এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
উড়োজাহাজ লিজের বকেয়া ৩৭ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বন্ধ হয়ে যাওয়া রিজেন্ট এয়ারওয়েজের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডকে অবসায়নের (Liquidation) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির পাওনা আদায়ে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী হাবিব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি স্বীকৃত ও পরিশোধযোগ্য ঋণ বা বকেয়া অর্থ পরিশোধের দায় এড়াতে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।
হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চের বিচারপতি মো. তৌফিক ইনাম গত ১৯ আগস্ট এ রায় দেন। পরে ১৭ অক্টোবর ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।
রায়ে পাওনাদার প্রতিষ্ঠানের ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ মার্কিন ডলার ৩৮ সেন্ট আদায়ের লক্ষ্যে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসিফ বিন আনোয়ারকে সরকারি অবসায়ক (লিকুইডেটর) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তাঁকে এক সপ্তাহের মধ্যে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু এবং দুই মাসের মধ্যে এইচজি এভিয়েশনের অবসায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির সঙ্গে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের একটি উড়োজাহাজ লিজ চুক্তি হয়। ওই চুক্তির আওতায় রিজেন্ট এয়ারওয়েজ পরিচালনার জন্য একটি ব্যবহৃত বোয়িং ৭৩৭-৭০০ উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া হয়।
চুক্তিতে উইলমিংটন ট্রাস্ট উড়োজাহাজটির মালিকপক্ষের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে উড়োজাহাজের ভাড়া ও অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা ছিল এইচজি এভিয়েশনের।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি লিজের ভাড়া ও চুক্তির অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে বকেয়া অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
উইলমিংটন ট্রাস্টের দাবি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এইচজি এভিয়েশনের কাছে তাদের পাওনা দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার। এর বাইরে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য সুদ ও অন্যান্য পাওনাও রয়েছে।
পাওনা আদায়ের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি, ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি আইনি নোটিশ পাঠায়।
পরবর্তী সময়ে এইচজি এভিয়েশনের আইনজীবীরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বকেয়া অর্থ পরিশোধের দায় স্বীকার করেন এবং নতুন সময়সূচি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে সম্মত হন।
তবে সংশোধিত পরিশোধ পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে পাওনা আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয় উইলমিংটন ট্রাস্ট।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, এইচজি এভিয়েশন কখনো মূল পাওনার দায় অস্বীকার করেনি। বরং প্রতিষ্ঠানটি বকেয়া অর্থের দায় স্বীকার করে তা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি।
আদালতের মতে, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা বলে স্বীকৃত আর্থিক দায় অনির্দিষ্টকালের জন্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মার্কিন প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে আদালতে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মো. মোক্তাদির রহমান। অন্যদিকে এইচজি এভিয়েশনের পক্ষে শুনানিতে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণমাধ্যমকে ব্যারিস্টার মোক্তাদির রহমান জানান, উইলমিংটন ট্রাস্ট বিভিন্ন সময়ে রিজেন্ট এয়ারওয়েজকে উড়োজাহাজ লিজ দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করেনি।
তিনি বলেন, এসব লিজ চুক্তিতে হাবিব গ্রুপের আরও ১০টি প্রতিষ্ঠান জামিনদার হিসেবে ছিল। পাওনা আদায়ের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার পরও সফল না হওয়ায় ২০২৩ সালে হাবিব গ্রুপের মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবসায়নের আবেদন করা হয়।
এখন পর্যন্ত আদালত শুধু এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ পাওনা আদায় করা সম্ভব না হলে গ্রুপটির অন্য ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আদালতের চলতি মাসের অবকাশ শেষে বাকি আবেদনগুলোর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের আইনজীবী।
এইচজি এভিয়েশন ছাড়াও হাবিব গ্রুপের যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবসায়নের আবেদন করা হয়েছে, সেগুলো হলো হাবিব স্টিলস লিমিটেড, ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেড, লিগ্যাসি ফ্যাশন লিমিটেড, রিজেন্ট স্পিনিং মিলস লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সিয়াম সুপিরিয়র লিমিটেড, এমটিএস রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, আনোয়ারা পেপার মিলস লিমিটেড, রিজেন্ট পাওয়ার লিমিটেড এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজ লিমিটেড।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাবিব গ্রুপের এই ১১টি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারি সংস্থা, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত পাওনার পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।
তবে এই সম্মিলিত পাওনা এবং উইলমিংটন ট্রাস্টের উড়োজাহাজ লিজসংক্রান্ত দাবি পৃথক বিষয়।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত অবসায়ক এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের অবসায়ন কার্যক্রম শুরু করবেন। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ, দায়দেনা ও পাওনাদারদের দাবি আইন অনুযায়ী যাচাই এবং পাওনা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অর্থ এই নয় যে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে তার সম্পূর্ণ পাওনা ফেরত পেয়েছে। বরং আদালতের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দায় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুই মাসের মধ্যে অবসায়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ থাকায় পরবর্তী সময়ে পাওনা আদায় এবং অন্যান্য জামিনদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রিজেন্ট এয়ারওয়েজের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের এ আদেশ বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে উড়োজাহাজ লিজ চুক্তি, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক পাওনাদারদের দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: হাইকোর্টের রায়সংক্রান্ত প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বক্তব্য।
মন্তব্য করুন