aviation
প্রকাশিত: 6 October 2026, 12:28:39 Pm
অনলাইন সংস্করণ

শাহজালালে স্ক্যানার অপারেটরদের রেডিয়েশন ঝুঁকি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন

বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে এক্স-রে স্ক্যানারসহ বিভিন্ন আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি। কিন্তু এসব যন্ত্রের পাশে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত রেডিয়েশন সুরক্ষা ও মনিটরিং নিশ্চিত হচ্ছে কি না—তা এবার খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বাপশনিক)।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে যাত্রীদের ব্যাগেজ ও কার্গো পরীক্ষায় ব্যবহৃত স্ক্যানিং যন্ত্রের নিরাপত্তা মান, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ জন্য বাপশনিক ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ পরিদর্শন দল গঠন করেছে। ইতোমধ্যে বিমানবন্দরে ব্যবহৃত বিভিন্ন স্ক্যানিং যন্ত্র পরিদর্শনও করেছে দলটি।

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি, যাতে বিমানবন্দরের স্ক্যানার থেকে কর্মীরা মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি বর্তমানে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ আছে কি না—সেটি যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

শাহজালালে অর্ধশতাধিক স্ক্যানিং যন্ত্র

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ইকুইপমেন্ট শাখার তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে কেবিন ব্যাগেজ স্ক্যানিং (CBS), হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিং (HBS) এবং Explosive Trace Detector (ETD) মিলিয়ে অর্ধশতাধিক যন্ত্র রয়েছে।

এর মধ্যে স্মিথস ডিটেকশন ও র‌্যাপিসক্যানের ২২টি ডুয়েল ভিউ কেবিন ব্যাগেজ স্ক্যানার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি সচল এবং দুটি অকেজো।

বড় লাগেজ পরীক্ষার জন্য রয়েছে ২০টি HBS মেশিন। এর মধ্যে ১৮টি সচল এবং দুটি অকেজো।

এ ছাড়া বিস্ফোরকের উপস্থিতি শনাক্ত করতে ১০টি ETD মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে এসব যন্ত্র একই প্রযুক্তিতে কাজ করে না। বিশেষ করে এক্স-রে ব্যাগেজ স্ক্যানারের রেডিয়েশন নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে ETD-এর কার্যপদ্ধতিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। কর্মীদের সম্ভাব্য রেডিয়েশন এক্সপোজারের ক্ষেত্রে মূলত সংশ্লিষ্ট এক্স-রে যন্ত্রের নিরাপত্তা, শিল্ডিং ও অপারেটিং পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো যন্ত্র ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কর্মীদের উদ্বেগ

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ যাত্রীরা ব্যাগেজ স্ক্যানিং এলাকার কাছে খুব অল্প সময় অবস্থান করেন। অন্যদিকে অপারেটরদের নির্ধারিত শিফটে দীর্ঘ সময় এসব যন্ত্রের আশপাশে দায়িত্ব পালন করতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কোনো এক্স-রে স্ক্যানিং যন্ত্রের শিল্ডিং বা লেড কার্টেন ক্ষতিগ্রস্ত হলে, রেডিয়েশন লিকেজ তৈরি হলে কিংবা প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি থাকলে কর্মীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহজালাল বিমানবন্দরের এক স্ক্যানিং অপারেটর অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় স্ক্যানিং মেশিনের পাশে দায়িত্ব পালন করলেও কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত রেডিয়েশন মনিটরিং ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই।

বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মনিটরিং ডিভাইসের ঘাটতির কথাও জানান তিনি।

তবে কর্মীর এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের স্ক্যানারগুলো থেকে মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশন ছড়াচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিষয়টির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পরিমাপ ও বাপশনিকের পরিদর্শন প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।

কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে অতিরিক্ত রেডিয়েশন

চিকিৎসকদের মতে, মাত্রাতিরিক্ত আয়নাইজিং রেডিয়েশনের সংস্পর্শে দীর্ঘমেয়াদে থাকলে মানবদেহের কোষ ও ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এক্সপোজারের মাত্রা ও সময়সহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত রেডিয়েশন এক্সপোজার ক্যানসারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। উচ্চমাত্রার এক্সপোজারে চোখের লেন্সসহ শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে রেডিয়েশন উপস্থিত থাকা এবং ক্ষতিকর মাত্রায় রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসা এক বিষয় নয়। সঠিকভাবে শিল্ডিং করা, নিয়মিত পরীক্ষিত এবং নিরাপত্তা মান মেনে পরিচালিত এক্স-রে স্ক্যানারের ক্ষেত্রে অপারেটরের প্রকৃত এক্সপোজার কত—সেটি পরিমাপ ছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বাপশনিকের ১১ সদস্যের দল কী দেখছে

স্ক্যানিং মেশিনের নিরাপত্তা মান ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাই করতে গত ৩০ আগস্ট বাপশনিকের বিকিরণ, পরিবহন ও বর্জ্য নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ড. জাহানারা বেগমের স্বাক্ষরিত আদেশে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়।

পরিদর্শন শেষে ড. জাহানারা বেগম জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে ব্যবহৃত বিভিন্ন স্ক্যানিং মেশিন পরিদর্শন করা হয়েছে।

একই সঙ্গে কর্মীদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি, মেশিনগুলোর অনুমোদন, লাইসেন্সিং এবং বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা হচ্ছে।

পরিদর্শন ও মূল্যায়ন শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরির কথা রয়েছে।

ফলে বিমানবন্দরের স্ক্যানিং যন্ত্রে রেডিয়েশন নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র এবং কোথাও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন কি না—তা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের পর আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।

নিয়মিত লিকেজ পরীক্ষা ও মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য স্ক্যানিং প্রযুক্তি প্রয়োজনীয়। তবে কোনো যন্ত্রে ত্রুটি থাকলে অতিরিক্ত রেডিয়েশন ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে নিয়মিত পরীক্ষা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী রেডিয়েশন লিকেজ পরীক্ষা, ব্যক্তিগত ডোজ মনিটরিং, নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি এবং কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে স্ক্যানিং যন্ত্রের শিল্ডিং, লেড কার্টেন ও নিরাপত্তা ইন্টারলক ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

নতুন যন্ত্র চালুর আগে এবং বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের পর প্রয়োজনীয় সেফটি সার্ভে করা হলে সম্ভাব্য ত্রুটি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।

বেবিচক বলছে, পরিদর্শনের পর নেওয়া হবে ব্যবস্থা

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিচালক (সিএনএস-মেইনটেন্যান্স) প্রকৌশলী মো. আবদুল্লাহ কায়সার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পরিদর্শন করছে।

তাদের পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

নিরাপত্তার প্রযুক্তি, কর্মীর নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ

বিমানবন্দরে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও নিষিদ্ধ বস্তু শনাক্তে আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং নিরাপত্তা মান মেনে পরিচালনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অপারেটরদের সম্ভাব্য এক্সপোজার পর্যবেক্ষণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় এসব যন্ত্রের কাছাকাছি দায়িত্ব পালন করা কর্মীদের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে রেডিয়েশন মাত্রা পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে একদিকে কর্মীদের উদ্বেগের যথাযথ উত্তর পাওয়া যাবে, অন্যদিকে কোনো বাস্তব ঝুঁকি থাকলে সেটিও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এখন নজর থাকবে বাপশনিকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের দিকে। সেই প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হওয়ার কথা—বিমানবন্দরের স্ক্যানিং যন্ত্রগুলোর রেডিয়েশন নিরাপত্তা মান কতটা সন্তোষজনক এবং কর্মীদের সুরক্ষায় নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন কি না।

সূত্র: বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বাপশনিক)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশে সরবরাহ করা জেট ফুয়েলে ভেজালের প্রমাণ মিলল

1

ঢাকা-যশোর রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালু করছে ইউএস-বাংলা

2

আইকাও অডিটে সাফল্যেই খুলতে পারে ঢাকা–নিউ ইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট

3

ঢাকা–রিয়াদ রুটে রিয়াদ এয়ারের সরাসরি ফ্লাইট চালু

4

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরক

5

নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান পর্যটন মন্ত্

6

বিমানবন্দরে এআই নজরদারি, ছবি দিয়েই শনাক্ত হবে অপরাধী

7

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা–রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করল বিম

8

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্

9

শাহজালালে চার ফ্লাইটে সিআইআইডির অভিযান, স্বর্ণসহ ৪২ লাখ টাকা

10

বেবিচকের চাকরি কি সরকারি? পেনশন, পোস্টিং ও কর্মপরিবেশ কেমন?

11

বাংলাদেশে ভ্রমণে সতর্কতা কমাল যুক্তরাষ্ট্র, উন্নত হলো ট্রাভে

12

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের হাতে বিশ্বের সেরা এয়ারলাইনসের পুরস্কার

13

শাহজালালসহ দেশের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জা

14

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে বিধিনিষেধ: ১৫৩ ফ্লাইট ব্যাহত, ভোগান্ত

15

কমোডের ট্যাংকে ‘স্বর্ণের গুপ্তভাণ্ডার’, উদ্ধার ৪.২০৪ কেজি স্

16

DfT অডিটে বাংলাদেশের বিমানবন্দর নিরাপত্তায় বেবিচকের সাফল্য:

17

‘লাগেজের জন্য যাত্রী নয়, যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করবে লাগেজ’: ই

18

কম্বোডিয়ার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার ৩৮ বাংলাদেশি দেশে ফ

19

উড়োজাহাজ সংকট কাটাতে বড় বহর সম্প্রসারণে বিমান, বোয়িংয়ের পর এ

20