হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত ও প্রস্থানকারী যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শাটল সার্ভিস চালু করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দরের সঙ্গে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, জসিমউদ্দিন মোড় ও কাওলা এলাকার সংযোগ সহজ করতে তিনটি রুটে এ সেবা পরিচালিত হবে।
বুধবার (৮ জুলাই) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্যানোপির সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শাটল সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ, পিএসসি, জিডি(পি)।
বেবিচকের অর্থায়নে পরিচালিত এ সেবায় যাত্রীদের কোনো ভাড়া দিতে হবে না। বিশেষ করে ভারী লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর ও আশপাশের গণপরিবহন সংযোগস্থলের মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীদের জন্য এটি বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে।
প্রাথমিকভাবে ফ্রি শাটল সার্ভিসটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগে পরিচালনার কথা জানিয়েছে বেবিচক। সেগুলো হলো—
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব সংযোগস্থলের সঙ্গে বিমানবন্দরের যাত্রী চলাচল আরও সহজ করাই সেবাটির উদ্দেশ্য।
এর ফলে দূরপাল্লার বাস বা ট্রেনে ঢাকা পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে যাওয়া এবং ফ্লাইট শেষে বিমানবন্দর থেকে নিকটবর্তী গণপরিবহন সংযোগে পৌঁছানো কিছু যাত্রীর জন্য সহজ হতে পারে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে দুটি শাটল বাস ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর ক্যানোপির মধ্যবর্তী স্থান থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ার কথা জানানো হয়েছে।
তবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম, যানজট বা পরিচালন পরিস্থিতির কারণে বাস্তব সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে। তাই যাত্রীদের ফ্লাইট ধরার ক্ষেত্রে শুধু শাটল সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে খুব কম সময় হাতে নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা না করাই ভালো।
বেবিচক জানিয়েছে, ফ্রি শাটল সার্ভিসটি সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি প্রবীণ নাগরিক, নারী, শিশু, শারীরিকভাবে অসুবিধাগ্রস্ত এবং ভারী লাগেজ বহনকারী যাত্রীদের চলাচলে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।
বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে ‘last-mile connectivity’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শহরের বাস, ট্রেন বা অন্যান্য গণপরিবহন বিমানবন্দরের কাছাকাছি পৌঁছালেও টার্মিনাল পর্যন্ত লাগেজ নিয়ে যাওয়া অনেক যাত্রীর জন্য অসুবিধাজনক হতে পারে।
বিনামূল্যের শাটল ব্যবস্থা এই সংযোগের একটি অংশ সহজ করতে পারে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে রেলস্টেশন থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রেনে আসা যাত্রীরা বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে এটি ব্যবহার করেন।
কিন্তু রেলস্টেশন থেকে ভারী লাগেজ নিয়ে টার্মিনালে পৌঁছানো প্রবীণ, শিশু সঙ্গে থাকা পরিবার বা বিশেষ সহায়তাপ্রয়োজনীয় যাত্রীদের জন্য তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
শাটল সার্ভিসের আওতায় বিমানবন্দর রেলস্টেশন যুক্ত থাকায় এই অংশের যাত্রীদের জন্য গণপরিবহন থেকে বিমানবন্দরের টার্মিনাল পর্যন্ত সংযোগ আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শাটল সার্ভিস চালুর আরেকটি উদ্দেশ্য হিসেবে বিমানবন্দর এলাকায় ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলা হয়েছে।
যাত্রীরা যদি বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন বা আশপাশের নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে শাটল ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে স্বল্প দূরত্বের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্য যানবাহনের প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে।
তবে বিমানবন্দর এলাকার সামগ্রিক যানজটে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়বে, সেটি যাত্রীদের ব্যবহার, শাটলের সংখ্যা, ফ্রিকোয়েন্সি এবং ভবিষ্যতে সেবাটির পরিধির ওপর নির্ভর করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান ও চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় বিনামূল্যের শাটল সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের যাত্রীসেবার মূলমন্ত্র হিসেবে ‘সম্মানিত যাত্রী সর্বাগ্রে’ ব্যবহার করছে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটেও এই নীতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী অভিজ্ঞতা শুধু টার্মিনালের ভেতরের check-in, immigration বা baggage delivery-এর ওপর নির্ভর করে না। বিমানবন্দরে পৌঁছানো এবং ফ্লাইট শেষে সহজে শহরের পরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারাও সামগ্রিক airport experience-এর অংশ।
বিশেষ করে বিদেশফেরত যাত্রীদের অনেকের সঙ্গে একাধিক লাগেজ থাকে। আবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রেন বা বাসে এসে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাত্রী।
ফলে বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও বাসস্ট্যান্ডের মধ্যে কার্যকর এবং নিয়মিত শাটল সংযোগ থাকলে যাত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ঘাটতি কমানো সম্ভব হতে পারে।
ফ্রি শাটল চালু হওয়া যাত্রীসেবায় ইতিবাচক সংযোজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত সময়সূচি, পর্যাপ্ত বাস, সহজে শনাক্তযোগ্য স্টপেজ, লাগেজ রাখার সুবিধা এবং যাত্রীদের কাছে পরিষ্কার তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ওপর।
বিশেষ করে নতুন যাত্রী বা বিদেশি ভ্রমণকারীরা যাতে বিমানবন্দরে নেমেই কোথা থেকে শাটল পাওয়া যাবে, কোন রুটে যাবে এবং পরবর্তী বাস কখন ছাড়বে—এসব তথ্য সহজে জানতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকলে সেবাটি আরও ব্যবহারবান্ধব হবে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বছরে ৮ মিলিয়নের বেশি যাত্রী চলাচল করেন। ফলে টার্মিনালের পাশাপাশি বিমানবন্দরের আশপাশে সহজ গণপরিবহন সংযোগও যাত্রীসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নতুন ফ্রি শাটল সার্ভিসটি নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালিত হলে বিশেষ করে রেল ও বাস ব্যবহারকারী যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাতায়াত আরও সহজ করার সুযোগ রয়েছে।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)
মন্তব্য করুন