দেশের পর্যটন খাতকে আরও নিরাপদ, আকর্ষণীয় ও টেকসই করতে নতুন পর্যটন গন্তব্য উন্নয়নের পাশাপাশি লাইফগার্ড সেবা, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে মানিকগঞ্জে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় এক পর্যটকের মৃত্যুর পর কক্সবাজারসহ দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, এমপি।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন ভবনে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রস্তাবিত ‘মানিকগঞ্জ জেলা ভিত্তিক পর্যটন সার্কিট গঠন, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের ডিপিপি যাচাই কমিটির সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত পর্যটন সার্কিটে মানিকগঞ্জের নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় Tourist Information and Service Centre, Handicraft Centre এবং Lifeguard Service Centre স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এ ধরনের সমন্বিত পর্যটন সার্কিট বাস্তবায়িত হলে পর্যটকের জন্য শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং তথ্যসেবা, স্থানীয় পণ্য, নিরাপত্তা এবং একাধিক পর্যটন আকর্ষণকে একই ভ্রমণ পরিকল্পনার মধ্যে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নৌযানের নিরাপত্তা, লাইফ জ্যাকেট, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, আবহাওয়ার সতর্কতা এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাকে শুরু থেকেই পরিকল্পনার অংশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় ঐতিহাসিক বালিয়াটি প্রাসাদ, ধামরাই লোকশিল্প কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পর্যটন সম্পদ সংরক্ষণ, পুনর্বাসন ও পর্যটনবান্ধবভাবে উন্নয়নের নির্দেশ দেন পর্যটনমন্ত্রী।
মন্ত্রী প্রতিটি পর্যটন এলাকার জন্য স্বতন্ত্র থিম নির্ধারণ করে প্রকল্প তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
একটি পর্যটন গন্তব্যের নিজস্ব পরিচয় তৈরি হলে সেটিকে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা সহজ হয়। মানিকগঞ্জের ক্ষেত্রে নদী, জমিদারবাড়ি, লোকশিল্প, স্থানীয় খাবার ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমন্বিত করে একটি স্বতন্ত্র পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
নতুন পর্যটন গন্তব্যকে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী।
টেকসই পর্যটনের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটক বাড়লেও স্থানীয় জনগোষ্ঠী যদি তার অর্থনৈতিক সুফল না পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে একটি গন্তব্যের টেকসই উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় হস্তশিল্প, খাবার, পরিবহন, গাইড সেবা, হোমস্টে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটকের ব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে।
মন্ত্রী জানান, পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলসংলগ্ন অতিথিশালাগুলোকে সাধারণ মানুষের জন্য পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া হবে।
এ ধরনের স্থাপনাকে পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত করা হলে মূল অবকাঠামোর পাশাপাশি আশপাশে নতুন পর্যটন কার্যক্রম তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা, যান চলাচল এবং পরিচালন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে।
সভায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সাম্প্রতিক প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় এক পর্যটকের মৃত্যুর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
মন্ত্রী ওই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বলেন।
তবে কারও দায় বা আইনি অপরাধ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
প্যারাসেইলিং, জেট স্কি, স্পিডবোট, কায়াকিং বা অন্যান্য অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম সাধারণ পর্যটনের তুলনায় বাড়তি ঝুঁকি বহন করতে পারে।
তাই শুধু অপারেটরের ব্যবসায়িক অনুমতি থাকাই যথেষ্ট নয়। সরঞ্জামের নিয়মিত পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত অপারেটর, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, যাত্রীর জন্য নিরাপত্তা নির্দেশনা, লাইফ জ্যাকেট এবং কার্যকর জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো বিপুল পর্যটকসমাগমের এলাকায় বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমের জন্য সুস্পষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং নিয়মিত তদারকি পর্যটকদের আস্থা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রচারণামূলক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্ভাবনা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে ডিজিটাল উপস্থিতি এখন গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দর্শনীয় স্থানের ছবি প্রকাশ নয়—কীভাবে সেখানে যাওয়া যাবে, কোথায় থাকা যাবে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্থানীয় পরিবহন, ভ্রমণের উপযুক্ত সময় এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্যও একটি কার্যকর পর্যটন প্ল্যাটফর্মে সহজে পাওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ নতুন পর্যটন গন্তব্য ও সার্কিট তৈরির দিকে এগোলেও পর্যটকের আস্থা ধরে রাখতে নিরাপত্তাকে একই সঙ্গে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মানিকগঞ্জের প্রস্তাবিত প্রকল্পে Lifeguard Service Centre অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা এবং কক্সবাজারের ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ—দুটিই পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তাকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
নতুন পর্যটন অবকাঠামো, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, কার্যকর প্রচারণা এবং পর্যটকের নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের নতুন গন্তব্যগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়া সহজ হবে।
সূত্র: বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সভাসংক্রান্ত তথ্য ও প্রকাশিত সংবাদ
মন্তব্য করুন