এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারকে সরাসরি আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগের আওতায় আনতে বিমানবন্দরটির অবকাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সমুদ্রের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল, বড় এপ্রোন ও ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিমানবন্দরটিকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)।
বর্তমানে কক্সবাজার দেশের ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর একটি। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী এবং ৬ থেকে ১০টি কার্গো বিমান এখানে উড্ডয়ন ও অবতরণ করছে।
ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা এবং কক্সবাজারকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি রানওয়ে সম্প্রসারণ।
প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান প্রায় ৯ হাজার ফুট রানওয়েকে সমুদ্রের দিকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে।
এ জন্য সমুদ্র থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধার, বাঁধ নির্মাণ এবং রানওয়েসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে Precision Approach Lighting এবং CAT-II Airfield Ground Lighting (AGL) ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা যুক্ত করার কাজ রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রানওয়ে ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সক্ষমতা উন্নত হলে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০-এর মতো বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
তবে শুধু রানওয়ের দৈর্ঘ্য কোনো নির্দিষ্ট বড় উড়োজাহাজের নিয়মিত অপারেশন নিশ্চিত করে না। রানওয়ের কাঠামোগত সক্ষমতা, ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোন, নেভিগেশন ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক অনুমোদনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল।
প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য পৃথক আগমন ও প্রস্থান সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে।
টার্মিনালে থাকছে ইমিগ্রেশন কাউন্টার, চেক-ইন সুবিধা, কনভেয়ার বেল্ট, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর ও ডিউটি ফ্রি শপসহ আধুনিক যাত্রীসেবার বিভিন্ন ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য প্রায় ৪৫০ জন ধারণক্ষমতার প্রস্থান লাউঞ্জ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় টার্মিনালের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা, কার পার্কিং, অভ্যন্তরীণ সড়ক, নিরাপত্তা ফেন্সিং, পাম্প হাউস এবং চিলার সাব-স্টেশনসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
শুধু টার্মিনাল নয়, বিমানবন্দরের এয়ারসাইড সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় এমন এপ্রোন তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একই সময়ে দুটি সুপরিসর বা ওয়াইডবডি এবং তিনটি ড্যাশ-৮ শ্রেণির উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
এ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ট্যাক্সিওয়ে। এসব অবকাঠামোর একটি অংশ ইতোমধ্যে বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়লে উড়োজাহাজের দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড এবং একাধিক ফ্লাইট ব্যবস্থাপনায় এপ্রোন ও ট্যাক্সিওয়ের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন শুধু চলমান প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না বেবিচক।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বিমানবন্দরটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের আরও যাত্রীসেবা অবকাঠামোর পাশাপাশি কার্গো কমপ্লেক্স, আধুনিক কন্ট্রোল টাওয়ার, বিজনেস সেন্টার, এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার বিমানবন্দর শুধু পর্যটক পরিবহন নয়, ভবিষ্যতে কার্গো ও অন্যান্য এভিয়েশন কার্যক্রমেও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারে।
কক্সবাজারে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা হয়ে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কক্সবাজারে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরি হলে ভ্রমণের সময় ও ধাপ—দুটিই কমানোর সুযোগ রয়েছে।
এর সুফল কেবল কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মেরিন ড্রাইভ, মহেশখালীসহ বৃহত্তর কক্সবাজার অঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল-রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হবে না। আন্তর্জাতিক অপারেশনের জন্য কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তও প্রয়োজন হবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা, আন্তর্জাতিক টার্মিনাল নির্মাণ এবং এপ্রোন-ট্যাক্সিওয়ের সক্ষমতা বাড়ানো দেশের পর্যটননির্ভর এভিয়েশন অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে বিমানবন্দরটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব অবকাঠামোকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও টেকসই যাত্রী চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা যায় কি না, তার ওপর।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপারেশনের সব শর্ত পূরণ এবং বিদেশি ও দেশীয় এয়ারলাইন্সকে কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনায় আকৃষ্ট করা গেলে পর্যটননগরীটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আকাশ প্রবেশদ্বারে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য
মন্তব্য করুন