এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
গর্ভাবস্থায় বিমানভ্রমণ করা যাবে কি না, কত মাস পর্যন্ত বিমানে ওঠা নিরাপদ এবং বিমানযাত্রার আগে চিকিৎসকের অনুমতি প্রয়োজন কি না—এসব প্রশ্ন অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারীর মনে থাকে। বিশেষ করে বিদেশে চিকিৎসা, পারিবারিক প্রয়োজনে ভ্রমণ কিংবা ছুটি কাটাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে গর্ভবতী যাত্রীদের জন্য বিমান সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থা স্বাভাবিক থাকলে অধিকাংশ নারীর জন্য বিমানভ্রমণ সাধারণত নিরাপদ। তবে গর্ভের বয়স, মায়ের শারীরিক অবস্থা, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার নীতিমালার ওপর নির্ভর করে ভ্রমণের অনুমতি।
সাধারণভাবে জটিলতামুক্ত একক গর্ভাবস্থায় ৩৬ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে বিমানভ্রমণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে অনেক বিমান সংস্থা ৩৬ সপ্তাহ শুরু হওয়ার পর গর্ভবতী যাত্রীদের পরিবহন করে না।
অন্যদিকে যমজ বা একাধিক সন্তান গর্ভে থাকলে সাধারণত ৩২ সপ্তাহের পর বিমানভ্রমণে আরও কঠোর বিধিনিষেধ থাকে।
তবে সব বিমান সংস্থার নিয়ম এক নয়। কোনো কোনো এয়ারলাইন্স গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট সময়ের পর চিকিৎসকের সনদ চায়। আবার কিছু বিমান সংস্থা আরও আগেই ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
তাই টিকিট কেনার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার গর্ভবতী যাত্রী পরিবহনসংক্রান্ত নীতিমালা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বা সাধারণভাবে ১৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের সময়টি অনেক নারীর জন্য ভ্রমণের তুলনামূলক সুবিধাজনক সময়।
এ সময় প্রথম তিন মাসের বমি বমি ভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তি অনেকের ক্ষেত্রে কমে আসে। পাশাপাশি গর্ভাবস্থার শেষ দিকে দেখা দেওয়া শারীরিক অস্বস্তিও তুলনামূলক কম থাকে।
তবে এই সময়েও সবার শারীরিক অবস্থা এক রকম নয়। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তপাত, অকাল প্রসবের ঝুঁকি কিংবা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিমানভ্রমণ করা উচিত নয়।
অনেক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা গর্ভাবস্থার ২৮ সপ্তাহের পর চিকিৎসকের সনদ বা ‘ফিট টু ফ্লাই’ সার্টিফিকেট চাইতে পারে।
এই সনদে সাধারণত গর্ভাবস্থার সময়কাল, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ, গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা আছে কি না এবং যাত্রী বিমানভ্রমণের উপযুক্ত কি না—এসব তথ্য উল্লেখ করতে হয়।
কিছু বিমান সংস্থা নির্ধারিত ফরমে চিকিৎসকের অনুমোদন চায়। আবার কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইস্যু করা মেডিকেল সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
চিকিৎসকের সনদ থাকলেই যে সব পরিস্থিতিতে বিমানে ওঠার অনুমতি পাওয়া যাবে, তা নয়। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সর্বোচ্চ গর্ভকালসীমা ও অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে।
গর্ভাবস্থায় কিছু শারীরিক জটিলতা থাকলে বিমানভ্রমণ মা ও অনাগত সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে যোনিপথে রক্তপাত, অকাল প্রসবের আশঙ্কা, পানি ভেঙে যাওয়া, গুরুতর রক্তশূন্যতা, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পসিয়া অথবা হৃদ্রোগ ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা থাকলে ভ্রমণের আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এ ছাড়া আগে অকাল প্রসবের ইতিহাস থাকলে কিংবা বর্তমান গর্ভাবস্থাকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় বসে থাকলে গর্ভবতী নারীদের পায়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়তে পারে। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই এই ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।
তাই দীর্ঘ ফ্লাইটে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া উচিত।
বিমানে ভ্রমণের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, আরামদায়ক পোশাক পরা এবং নিরাপদ হলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করা উপকারী হতে পারে।
বসে থাকা অবস্থায় পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতা নাড়াচাড়া করাও সহায়ক।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত কম্প্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে উড্ডয়ন, অবতরণ কিংবা টার্বুলেন্সের সময় অবশ্যই আসনে বসে সিটবেল্ট বাঁধতে হবে।
বিমানে গর্ভবতী নারীদেরও সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হয়।
সিটবেল্টের নিচের অংশ পেটের ওপর দিয়ে না বেঁধে পেটের নিচে, নিতম্বের ওপর দিয়ে যথাসম্ভব নিচু ও আঁটসাঁটভাবে বাঁধা উচিত।
এতে আকস্মিক ঝাঁকুনি বা টার্বুলেন্সের সময় আঘাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
সিটবেল্ট ব্যবহারে অসুবিধা হলে কেবিন ক্রুদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
গর্ভবতী যাত্রীদের ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সঙ্গে রাখা উচিত।
বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শপত্র, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখসংক্রান্ত তথ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের চাওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট সঙ্গে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশভ্রমণের ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশের চিকিৎসাসেবা, ভ্রমণবিমার মাতৃত্বসংক্রান্ত সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কেও আগাম খোঁজ নেওয়া ভালো।
একই সঙ্গে ফেরার ফ্লাইটের তারিখে গর্ভাবস্থার কত সপ্তাহ পূর্ণ হবে, সেটিও হিসাব করতে হবে। কারণ যাওয়ার সময় বিমানে ওঠার অনুমতি পাওয়া গেলেও ফেরার সময় গর্ভকাল বেড়ে যাওয়ায় এয়ারলাইন্সের বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হতে পারে।
গর্ভবতী যাত্রীদের জন্য বিমান সংস্থাভেদে ভিন্ন নিয়ম থাকায় আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে টিকিট বুকিংয়ের আগেই এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভ্রমণের শর্ত নিশ্চিত করা উচিত।
বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদ দেখাতে না পারলে কিংবা নির্ধারিত গর্ভকালসীমা অতিক্রম করলে বিমান সংস্থা যাত্রীকে বোর্ডিংয়ের অনুমতি না-ও দিতে পারে।
তাই গর্ভাবস্থায় বিমানভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ, এয়ারলাইন্সের নিয়ম এবং যাত্রীর ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।
সঠিক প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অনুসরণ করলে জটিলতামুক্ত গর্ভাবস্থায় অনেক নারী নিরাপদে বিমানভ্রমণ করতে পারেন।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA), যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (RCOG) এবং প্রচলিত এয়ারলাইন মেডিকেল গাইডলাইনের সাধারণ নির্দেশনা।
মন্তব্য করুন