এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের বাইরে থাকা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বেহালা বিমানবন্দর বা বেহালা ফ্লাইং ক্লাব পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। আঞ্চলিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট, ছোট উড়োজাহাজ, চার্টার্ড সার্ভিস এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার সম্ভাবনা যাচাইয়ে বিমানবন্দরটির জমি, রানওয়ে ও আশপাশের অবকাঠামো নিয়ে আকাশ ও স্থল জরিপ চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ড্রোন জরিপে গোপালপুর, বেহালা ও পোরুই—এই তিন মৌজা মিলিয়ে বিমানবন্দরটির দখলে প্রায় ২১৫ দশমিক ৬ একর জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে ব্যবহারের জন্য বিবেচিত রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯১৫ মিটার। রাজ্য সরকারের প্রস্তাবে ATR-72 ধরনের আঞ্চলিক উড়োজাহাজ পরিচালনার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, চলমান কারিগরি জরিপে ছোট ৯ থেকে ১৯ আসনের উড়োজাহাজ দিয়ে কার্যক্রম শুরুর বাস্তবতাও যাচাই করা হচ্ছে।
বেহালা বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবনের অংশ হিসেবে প্রথমে ড্রোন ব্যবহার করে জমির সীমানা, সম্ভাব্য অবৈধ দখল এবং উড়োজাহাজের approach path-এর আশপাশের প্রতিবন্ধকতা যাচাই করা হয়। এরপর Airports Authority of India (AAI) ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের জরিপ শুরু করেন।
পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া ও যুববিষয়ক মন্ত্রী এবং বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক ইন্দ্রনীল খান AAI ও রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিমানবন্দরটি পরিদর্শন করেন।
চলমান জরিপের মাধ্যমে বিদ্যমান রানওয়ে ও অবকাঠামো ব্যবহার করে কী ধরনের উড়োজাহাজ নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব, কোথায় অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর আগে কী কী প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে—এসব বিষয় চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
রাজ্য সরকারের প্রস্তাবে ৯১৫ মিটার রানওয়েতে ATR-72 পরিচালনার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত অপারেশনাল পরিকল্পনা নয়।
সর্বশেষ মাঠপর্যায়ের জরিপ নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ড্রোন সমীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন প্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে প্রথম পর্যায়ে ৯ থেকে ১৯ আসনের ছোট উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ থাকতে পারে।
ATR-72-এর মতো বড় টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে শুধু রানওয়ের দৈর্ঘ্য যথেষ্ট নয়। উড়োজাহাজের ওজন, রানওয়ের কার্যকর দৈর্ঘ্য ও শক্তি, আবহাওয়া, obstacle clearance, approach/departure path এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
ফলে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নিয়ন্ত্রক মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগে বেহালা থেকে ATR-72 ফ্লাইট পরিচালনা নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বেহালা ফ্লাইং ক্লাব একসময় পাইলট প্রশিক্ষণ ও সাধারণ বিমান চলাচলের জন্য পরিচিত ছিল। তবে বছরের পর বছর ধরে এর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
AAI-এর পুরোনো নথিতে বেহালাকে মূলত General Aviation/Flying Club কার্যক্রমের উপযোগী বিমানবন্দর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং সেখানে নিয়মিত scheduled operation ছিল না।
বর্তমানেও বিমানবন্দরটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়; সীমিতভাবে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারসহ কিছু বিমান চলাচল হয়ে থাকে। তবে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট নেই।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বর্তমান পরিকল্পনায় শুরু থেকেই বড় আকারের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিবর্তে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, ছোট যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ এবং চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিমানবন্দরটি দক্ষিণ কলকাতার কাছে হওয়ায় জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে ছোট উড়োজাহাজ বা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নতুন বিকল্প পাওয়া যেতে পারে।
পরবর্তী পর্যায়ে অবকাঠামো ও নিরাপত্তা মান প্রয়োজনীয় পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হলে আঞ্চলিক scheduled flight চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হতে পারে।
বেহালা বিমানবন্দর পুনরায় কার্যকর হলে দক্ষিণবঙ্গের পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগে নতুন সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা করছে রাজ্য সরকার।
বিশেষ করে গঙ্গাসাগর ও সুন্দরবন দক্ষিণবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য। বেহালা থেকে ছোট উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারভিত্তিক আঞ্চলিক সংযোগ তৈরি হলে পর্যটকদের জন্য দ্রুত যাতায়াতের নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে।
তবে এসব রুট বা সেবা এখনো পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে; নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ফ্লাইট ঘোষণা করা হয়নি।
বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো এর আশপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও AAI কর্মকর্তারা বিমানবন্দরের আশপাশের উঁচু ভবন ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। উড়োজাহাজের নিরাপদ approach ও departure নিশ্চিত করতে এসব obstacle সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করতে হবে।
এর পাশাপাশি বিমানবন্দরের সরু প্রবেশপথ, কিছু জমিতে অবৈধ দখল এবং সম্পূর্ণ সীমানাপ্রাচীর না থাকাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।
ইন্দ্রনীল খান জানিয়েছেন, প্রথম অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দরের সীমানা নির্ধারণ এবং সম্পূর্ণ perimeter সুরক্ষিত করা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দখলের বিষয় চিহ্নিত হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
কোনো দীর্ঘদিনের অচল বা সীমিত ব্যবহারের বিমানবন্দরকে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইটের জন্য চালু করতে শুধু রানওয়ে প্রস্তুত করলেই হয় না।
বেহালার ক্ষেত্রেও রানওয়ে ও এপ্রন সক্ষমতা, obstacle limitation, perimeter security, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার সক্ষমতা, যাত্রী টার্মিনাল, প্রবেশপথ, যোগাযোগ ও নেভিগেশন সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ একাধিক বিষয় মূল্যায়ন করতে হবে।
ফলে বর্তমান জরিপকে বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে না দেখে feasibility assessment-এর গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ।
বেহালা বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ এগিয়ে নিতে ভারতের কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ইন্দ্রনীল খান কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাম মোহন নাইডুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে রাজ্যের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
রাজ্য সরকারের যুক্তি, বেহালায় সীমিত আঞ্চলিক বিমান চলাচল চালু করা সম্ভব হলে দক্ষিণ কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা, পর্যটন এবং জরুরি চিকিৎসা পরিবহনে সুবিধা তৈরি হতে পারে।
এটি কলকাতার প্রধান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিছু সাধারণ ও ছোট উড়োজাহাজ কার্যক্রমের বিকল্পও তৈরি করতে পারে। তবে মূল কলকাতা বিমানবন্দরের যাত্রীচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে কি না, তা ভবিষ্যতে বেহালায় কী ধরনের এবং কতসংখ্যক ফ্লাইট পরিচালিত হয় তার ওপর নির্ভর করবে।
বর্তমানে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে চলমান জরিপের ফলাফল। এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে—বেহালার বিদ্যমান রানওয়ে ও জমি ব্যবহার করে কোন শ্রেণির উড়োজাহাজ বাস্তবসম্মতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব এবং নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট ফিরিয়ে আনতে কতটা অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
সূত্র: Airports Authority of India (AAI), PTI, The Telegraph ও Times of India
মন্তব্য করুন