aviation
প্রকাশিত: 3 October 2026, 11:50:03 Am
অনলাইন সংস্করণ

বিমানের ফ্লাইটে স্বর্ণ চোরাচালান: অভিযোগের তালিকায় শতাধিক কর্মী, জোরদার হচ্ছে নজরদারি

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রম ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় বিমানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় এয়ারলাইন ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, কর্মীদের প্রবেশাধিকার এবং নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদ ও একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, বিমানের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ২৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম স্বর্ণ পাচারে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের তালিকায় এসেছিল। ওই তালিকায় পাঁচজন পাইলট, চারজন কো-পাইলট, ২৫ জন কেবিন ক্রু, ১৫ জন ফ্লাইট স্টুয়ার্ড, তিনজন ফ্লাইট পার্সার এবং পাঁচজন চিফ পার্সারসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মীর কথা উল্লেখ করা হয়। 

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা অভিযোগের তালিকায় নাম থাকা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বর্তমান অবস্থা, বিভাগীয় ব্যবস্থার ফলাফল এবং বিচারিক নিষ্পত্তি পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে বড় স্বর্ণের চালান

বিমানকে ঘিরে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে উড়োজাহাজের ভেতর, কার্গো এলাকা কিংবা বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

২০২৬ সালের ২৮ মার্চ দুবাই থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তের আওতায় আসে। ওই ঘটনায় তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার সন্দেহের কথা বললেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও নাম প্রকাশ করা সমীচীন নয় বলে জানিয়েছিলেন। 

এ ধরনের ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবৈধ পণ্য কীভাবে প্রবেশ করছে এবং পরে সেটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবলয় অতিক্রম করার চেষ্টা হচ্ছে।

শুধু যাত্রী নয়, ‘ইনসাইডার থ্রেট’ও গুরুত্বপূর্ণ

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সাধারণ যাত্রীদের স্ক্রিনিং দৃশ্যমান অংশ হলেও এর বাইরেও বড় একটি নিরাপত্তাব্যবস্থা কাজ করে। পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, মেকানিক, ক্লিনার, ক্যাটারিং কর্মী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার এবং কার্গো কর্মীদের দায়িত্ব পালনের জন্য উড়োজাহাজ ও বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করতে হয়।

এই বৈধ প্রবেশাধিকার যদি কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র অপব্যবহার করে, সেটিকে বিমান নিরাপত্তার ভাষায় insider threat-এর একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফলে স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু আগত যাত্রী বা তাদের লাগেজ পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। কর্মীদের পরিচয় ও নিরাপত্তা যাচাই, restricted-area access control, নজরদারি, দায়িত্বের রেকর্ড এবং সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শত শত মামলা, তবুও মূল চক্র শনাক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ

বিমানবন্দর থানা সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ বছরে স্বর্ণ চোরাচালানসংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৭টি মামলা নিষ্পত্তি এবং বাকি ৫০টির তদন্ত চলছিল। ওই ৫০টির মধ্যে ৪২টি থানা পুলিশ এবং আটটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছিল।

তবে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা দিয়ে চোরাচালান নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে ফেলার চিত্র পাওয়া যায় না। বিশেষ করে পরিত্যক্ত অবস্থায় স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় প্রকৃত মালিক, অর্থদাতা, বহনকারী এবং দেশের ভেতরের গ্রহণকারী—পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা তদন্তকারীদের জন্য কঠিন হতে পারে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে।

কেন বিমানকর্মীদের নিরাপত্তা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ

একটি উড়োজাহাজ গন্তব্যে পৌঁছানোর পর স্বল্প সময়ের মধ্যে বহু ধরনের কর্মী সেটিতে প্রবেশ করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ক্যাটারিং, কারিগরি পরীক্ষা, ব্যাগেজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে পরবর্তী ফ্লাইটের প্রস্তুতি পর্যন্ত বিভিন্ন কাজ করতে হয়।

তাই কোনো একটি বিভাগের নিরাপত্তা শক্তিশালী করলেই সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এয়ারলাইন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ইমিগ্রেশন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় প্রয়োজন।

কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত প্রবেশাধিকার, প্রবেশ ও বের হওয়ার ডিজিটাল রেকর্ড, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি, CCTV coverage এবং সন্দেহজনক ঘটনার দ্রুত তদন্ত—এসব ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের পার্থক্য জরুরি

বিমানকর্মীদের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তির আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করা।

কোনো ব্যক্তিকে আটক করা, বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হওয়া, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম থাকা, মামলার আসামি হওয়া এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া—প্রতিটি আলাদা পর্যায়। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে নিশ্চিতভাবে চোরাচালানকারী হিসেবে উপস্থাপন না করা সংবাদমাধ্যমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে বিমানের কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার অর্থ পুরো প্রতিষ্ঠানের কর্মীবাহিনীকে এর সঙ্গে যুক্ত করা নয়। বরং পুনরাবৃত্ত ঘটনাগুলো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।

নিরাপত্তা জোরদারে কী কী বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে

স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু ঘটনার পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে কর্মীদের background verification, sensitive duty rotation, restricted-area access review, body-worn camera বা CCTV ব্যবহার, aircraft servicing chain-এর নজরদারি এবং বিভিন্ন সংস্থার গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বিমানের নিরাপত্তা বিভাগ এর আগেও অসাধু কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে লাগেজ ব্যবস্থাপনার নজরদারিতে বডি ক্যামেরা কেনার উদ্যোগের কথাও এসেছে। 

স্বর্ণ চোরাচালান তাই শুধু রাজস্ব বা আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি security, access control এবং institutional accountability-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা জোরদার করা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর হলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র: বিমানবন্দর থানা ও কাস্টমস সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন, বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা প্রতিবেদন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যার অভিযোগ, মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস

1

অক্টোবরে চালু হচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রস্ত

2

শাহজালালে গুলিভর্তি ব্যাগ: নিরাপত্তায় গাফিলতিতে কঠোর অবস্থান

3

বহরে যুক্ত হচ্ছে আরও ৩ ড্রিমলাইনার, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বা

4

মাদক পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ এয়ার ইন্ডিয়ার আরও দুই পাইল

5

অক্টোবরে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ১৬ ডিসেম্বরে সীমি

6

শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীসেবায় নতুন উদ্যোগ, ট্রলি ব্যবস্থা

7

আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ, ব্যয় হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার

8

বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ীকরণে ১৮ অক্টোবর সভা, চা

9

মাউন্ট এটনার ছাইয়ে টানা পাঁচ দিন বন্ধ ইতালির কাতানিয়া বিমানব

10

শাহজালালে এখনো ম্যানুয়াল তল্লাশি, বেল্ট-জুতা খুলে শরীর স্পর্

11

শক্তিশালী ‘নরইস্টার’-এর আঘাতে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর

12

সেপ্টেম্বরে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ফের চালু করবে এয়ার ইন্

13

ঢাকা বিমানবন্দরে ৭৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকারসহ দুজন আটক

14

ওভারটাইমে অনিয়মের অভিযোগ, বিমানের হ্যাঙ্গারে মাসে দেড় কোটি

15

অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক, ১০৯ আরোহী নিয়ে দিল্লিগামী ফ্লাইটের জরুরি

16

১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে বেবিচকে অনুষ্ঠিত হ

17

আলজেরিয়ার আকাশসীমায় আমিরাতের উড়োজাহাজ নিষিদ্ধ

18

ফ্লাইট কমলেও যাত্রী বেড়েছে ৬ লাখের বেশি, বদলে যাচ্ছে বাংলাদে

19

প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ফ্লাইট, বছরে ১ কোটি ২৫ লাখ যাত্রী—শাহজালা

20