এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ হারানো, চুরি ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিমানবন্দরে স্থাপন করা হয়েছে ৩৬টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ক্যামেরা। নতুন এ প্রযুক্তির মাধ্যমে লাগেজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি যাত্রীদের নিজেদের লাগেজের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শুধু ক্যামেরা স্থাপন নয়, উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং যাত্রীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে কার্যকর নজরদারির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। লাগেজ চুরি, কাটা ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধে কমিটি ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশের মাধ্যমে গঠিত কমিটিতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটি (এওসি) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কমিটির সুপারিশে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো, কর্মীদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে স্থাপিত ৩৬টি এআই ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানোর পর পরিবহন, বাছাই এবং আগমনী ব্যাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে এ প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
কোনো লাগেজ হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার স্থান ও সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করা সহজ হবে।
তবে ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং যাত্রীদের নির্দিষ্ট লাগেজের অবস্থান সরাসরি জানানো এক বিষয় নয়। যাত্রীরা কী পদ্ধতিতে এ তথ্য পাবেন এবং সুবিধাটি পুরোপুরি চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
তদন্ত কমিটি আগমনী ব্যাগেজ বেল্ট এলাকায় বড় পর্দায় লাগেজ পরিবহনের কার্যক্রম সরাসরি প্রদর্শনের সুপারিশ করেছে। এতে যাত্রীরা তাঁদের লাগেজ পরিবহনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
একই সঙ্গে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের যেসব স্থান সিসিটিভি নজরদারির বাইরে রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষ করে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানোর স্থান, লাগেজ পরিবহনের পথ, ব্যাগেজ ব্রেক-আপ এরিয়া এবং অ্যারাইভাল ব্যাগেজ বেল্টে নিয়মিত সিসিটিভি মনিটরিং নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
লাগেজ ওঠানো-নামানো ও পরিবহনের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীদের দায়িত্ব পালন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাগেজ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যাত্রার শুরুর বিমানবন্দর কিংবা ট্রানজিট স্টেশনে কোনো লাগেজ খোলা, ছেঁড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে গন্তব্য বিমানবন্দরকে আগাম অবহিত করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজের ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য ই-মেইলে পাঠানো এবং লাগেজে ড্যামেজ স্টিকার বা প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ চিহ্ন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এর মাধ্যমে লাগেজটি কোন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, তা নথিভুক্ত রাখা এবং পরবর্তী সময়ে অভিযোগ তদন্ত সহজ হবে বলে মনে করছে কমিটি।
লাগেজ হারানো, চুরি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত নিরীক্ষা, আকস্মিক পরিদর্শন এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে লাগেজসংক্রান্ত ১ হাজার ৩৮৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৭২টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় ১৫টি ক্ষেত্রে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে প্রায় ১ হাজার ১০০টি অভিযোগ জমা পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯১৪টি নিষ্পত্তির কথা জানানো হয়।
শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি লাগেজ সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার অভিযোগও রয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে যাত্রীদের ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষার অভিযোগ উঠে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও বেশি হওয়ার কথাও জানানো হয়।
এ পরিস্থিতিতে লাগেজ পরিবহন কার্যক্রমে দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই ক্যামেরাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তদন্ত কমিটি যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, লাগেজ নিরাপদে বহনের নিয়ম সম্পর্কে প্রচার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুপারিশও করেছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ৩৬টি এআই ক্যামেরা স্থাপন এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বাড়বে। তবে কার্যকর ফল পেতে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: বেবিচক
মন্তব্য করুন