বিমান কার্গোর মাধ্যমে অঘোষিত কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন ঠেকাতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাজুড়ে আরও শক্তিশালী ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA)। সংস্থাটি বলছে, শুধু বিমানবন্দরের নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের ওপর নির্ভর করে এ ধরনের ঝুঁকি পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
আইএটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সংস্থাটির কাছে রিপোর্ট হওয়া বিপজ্জনক পণ্যসংক্রান্ত ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশেই সংশ্লিষ্ট পণ্য অঘোষিত অথবা গোপন অবস্থায় কার্গো সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। এর মধ্যে লিথিয়াম ব্যাটারি, ই-সিগারেট ও অ্যারোসলের মতো পণ্য রয়েছে।
বিমান পরিবহনে বিপজ্জনক পণ্য বহন পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে যথাযথ ঘোষণা, প্যাকেজিং, লেবেলিং ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক পণ্য নিয়মিত আকাশপথে পরিবহন করা হয়। ঝুঁকি তৈরি হয় মূলত তখন, যখন কোনো পণ্য বিপজ্জনক হিসেবে ঘোষণা না করে, ভুলভাবে ঘোষণা করে অথবা এর প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে কার্গো নেটওয়ার্কে পাঠানো হয়।
আইএটিএ জানিয়েছে, বর্তমানে বিমানবন্দরে ব্যবহৃত কার্গো নিরাপত্তা স্ক্রিনিং ব্যবস্থা প্রধানত বিস্ফোরক এবং অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি শনাক্ত করার জন্য তৈরি। ফলে কার্গো চালানে থাকতে পারে এমন সব ধরনের বিপজ্জনক পণ্য শনাক্ত করার জন্য শুধু এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।
আইএটিএর গ্লোবাল হেড অব কার্গো ব্রেন্ডান সুলিভান বলেছেন, বিপজ্জনক পণ্য প্রতিদিনই নিরাপদে আকাশপথে পরিবহন করা হচ্ছে। কিন্তু এসব পণ্য অঘোষিত বা ভুলভাবে ঘোষিত অবস্থায় সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করলে ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের ঘটনা যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত ও প্রতিরোধে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি অংশীদারের ভূমিকা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ‘Safety and Security in the Cargo Supply Chain’ শীর্ষক একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে আইএটিএ। এতে বিমানবন্দরে কোনো চালান পৌঁছানোর আগেই সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারগুলোর প্রতি বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের নিয়ম বাস্তবায়নে তদারকি ও আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোকে বিক্রি করা পণ্যের সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো বিপজ্জনক পণ্য হিসেবে যথাযথভাবে শনাক্ত ও সনদ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
শিপার, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও ডাকসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, কার্গো গ্রহণের সময় যাচাই এবং চালানের তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএটিএ। এতে কোনো চালান বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে।
একই সঙ্গে এয়ারলাইনস ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে উড়োজাহাজে কার্গো তোলার আগের যাচাই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকেও এয়ারলাইন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএটিএ।
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংক, পাওয়ার টুল, ড্রোন, ই-বাইকসহ বর্তমানে অসংখ্য ইলেকট্রনিক পণ্যে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গো নেটওয়ার্কেও এসব ব্যাটারির উপস্থিতি ব্যাপক।
আইএটিএর তথ্য অনুযায়ী, আকাশপথে পরিবহন করা বিপজ্জনক পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই লিথিয়াম ব্যাটারি। অনুমোদিত নিয়মে এগুলো পরিবহন করা সম্ভব হলেও ভুল প্যাকেজিং, ক্ষতিগ্রস্ত বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি এবং পণ্যের তথ্য গোপন করা হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে লিথিয়াম ব্যাটারিতে ‘থার্মাল রানঅ্যাওয়ে’ ঘটলে দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে আগুন বা ধোঁয়া সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই ব্যাটারির ধরন, ক্ষমতা, অবস্থা, প্যাকেজিং এবং পরিবহনের পদ্ধতি নিয়ে বিমান পরিবহনে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
একটি কার্গো চালান বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই উৎপাদনকারী, বিক্রেতা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, শিপার, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার কিংবা ডাকসেবা প্রতিষ্ঠানের মতো একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে পারে।
আইএটিএর বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কাজটি যদি শুধু বিমানবন্দরের শেষ পর্যায়ের স্ক্রিনিংয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার আগের ধাপগুলোতে ভুল বা গোপন তথ্য দিয়ে পাঠানো বিপজ্জনক পণ্য শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
এ কারণেই সংস্থাটি একটি বহুস্তরীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ পণ্যের উৎস থেকে শুরু করে উড়োজাহাজে কার্গো তোলার আগ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তথ্য যাচাই ও ঝুঁকি শনাক্তের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়ে ই-কমার্সের প্রসারের ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ছোট চালান আন্তর্জাতিক কার্গো ও ডাক নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে। এসব চালানের মধ্যে অনেক ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ব্যাটারিচালিত ডিভাইসও রয়েছে।
কোনো বিক্রেতা বা প্রেরক যদি পণ্যে থাকা ব্যাটারির তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ না করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট শিপার, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার কিংবা এয়ারলাইন পণ্যটির সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য নাও পেতে পারে। তাই অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকেও সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে আইএটিএ।
আইএটিএর প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য বিপজ্জনক পণ্যের বৈধ বিমান পরিবহন বন্ধ করা নয়। বরং এ ধরনের পণ্য যেন শুরু থেকেই সঠিকভাবে ঘোষণা, শ্রেণিবিন্যাস, প্যাকেজিং ও শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় বিধিবিধান মেনে উড়োজাহাজে পরিবহন করা হয়—সেটিই নিশ্চিত করা।
বিশ্বব্যাপী ই-কমার্স ও ব্যাটারিচালিত পণ্যের ব্যবহার বাড়তে থাকায় বিমান কার্গো নিরাপত্তায় এই বহুস্তরীয় ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আইএটিএর মতে, ঝুঁকি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর শনাক্ত করার চেয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার শুরু থেকেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলা অধিক কার্যকর।
তথ্যসূত্র: International Air Transport Association (IATA)
মন্তব্য করুন