এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার পর ইরান ও ইরাকের মধ্যে বিমান যোগাযোগ আংশিকভাবে স্বাভাবিক হচ্ছে। ইরাকি সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের এয়ারলাইন্সগুলোকে নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪০টি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার বাইরে থাকছে ইরানের Mahan Air।
ইরাক বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় sanctions exemption পাওয়ার পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
এর ফলে ইরান থেকে নাজাফে যাতায়াতকারী ধর্মীয় পর্যটক, চিকিৎসাপ্রার্থী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য বিমান যোগাযোগের বড় একটি অংশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হলো।
নতুন ব্যবস্থায় ইরানের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স নাজাফে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ পেলেও Mahan Air-কে এর আওতায় রাখা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় Mahan Air দীর্ঘদিন ধরেই আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৩০ জুলাই Mahan Air-কে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে চীন, ভারত, রাশিয়া ও ইরানের ছয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয়। মার্কিন সরকারের অভিযোগ, এয়ারলাইনটি ইরানের Islamic Revolutionary Guard Corps বা IRGC-কে বিভিন্ন ধরনের পরিবহন ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে। Mahan Air-সংক্রান্ত এসব অভিযোগ ও নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান; ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নীতির বিরোধিতা করে আসছে।
ফলে নাজাফের জন্য দেওয়া নতুন ব্যবস্থাতেও Mahan Air-এর ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ বহাল থাকছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের Department of the Treasury ইরানের aviation sector-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৬টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এর মধ্যে ২৭টি ইরানি এয়ারলাইন্সও ছিল।
নিষেধাজ্ঞার পর ইরানি এয়ারলাইন্সকে ground handling বা অন্যান্য সেবা দিলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কায় বিদেশি service provider-রা সেবা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে শুরু করে।
এর প্রভাবে ইরানি এয়ারলাইন্সের ইরাকমুখী ফ্লাইটে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়। নাজাফের পাশাপাশি বাগদাদ, এরবিল ও সুলাইমানিয়াহ বিমানবন্দরেও ইরানি ফ্লাইট কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইরাকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ফ্লাইট স্থগিত করার সিদ্ধান্ত সরাসরি বাগদাদ নেয়নি; বরং নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে ground-handling প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা দিতে অনীহা থেকেই সমস্যাটি তৈরি হয়।
অচলাবস্থা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করে ইরাক।
ইরাকি সরকার চিকিৎসা, শিক্ষা, ধর্মীয় সফর এবং সাধারণ নাগরিকদের স্বার্থের কথা তুলে ধরে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় চেয়েছিল।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, সেই প্রচেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সাড়া এবং প্রয়োজনীয় exemption-এর ভিত্তিতে ইরানি এয়ারলাইন্সকে নাজাফে সর্বোচ্চ ৪০টি দৈনিক ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই exemption-এর বিস্তারিত শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করার তথ্য সীমিত। তাই ছাড়টির পরিধি সম্পর্কে ইরাকি সরকারের ঘোষণাই বর্তমানে প্রধান প্রকাশ্য ভিত্তি। আল জাজিরাও জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে exemption-টি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ইরান-ইরাক বিমান যোগাযোগে নাজাফ একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক গন্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নাজাফ ও কারবালা শিয়া মুসলিমদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গন্তব্য। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ইরানি ধর্মীয় পর্যটক এসব পবিত্র স্থান ভ্রমণ করেন।
একইভাবে ইরাক থেকেও অনেক যাত্রী ইরানের ধর্মীয় শহরগুলোতে যান।
ফলে দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগ বন্ধ হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি পড়ে religious travel বা ধর্মীয় পর্যটনে।
নিষেধাজ্ঞাজনিত ফ্লাইট সমস্যার প্রতিবাদে নাজাফ বিমানবন্দরের বাইরে এবং ইরাকের আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভও হয়েছিল।
ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ কাজেম আল-সাদেঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিধিনিষেধের আগে ইরান থেকে নাজাফে দৈনিক প্রায় ২৫টি এবং বাগদাদে প্রায় ১৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হতো।
তার হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার মানুষ ইরানি এয়ারলাইন্সে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করতেন। এই সংখ্যাগুলো ইরানি রাষ্ট্রদূতের দেওয়া হিসাব, স্বাধীন airport traffic statistics নয়।
সেই হিসাবে নাজাফে সর্বোচ্চ ৪০টি দৈনিক ফ্লাইটের অনুমতি দেওয়া হলেও এর অর্থ প্রতিদিন ঠিক ৪০টি ফ্লাইটই পরিচালিত হবে—এমন নয়।
এটি অনুমোদিত সর্বোচ্চ সক্ষমতা। প্রকৃত ফ্লাইট সংখ্যা নির্ভর করবে এয়ারলাইনের schedule, aircraft availability, যাত্রী চাহিদা, airport slot এবং ground-handling সক্ষমতার ওপর।
নাজাফে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ইরান-ইরাক বিমান যোগাযোগ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাগদাদ, এরবিল ও সুলাইমানিয়াহ বিমানবন্দরে এখনো বিধিনিষেধের মুখে রয়েছে।
ফলে নাজাফের জন্য পাওয়া exemption-কে ইরাকের সব বিমানবন্দরে ইরানি ফ্লাইট পুনরায় চালুর অনুমতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
অন্যান্য বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে আলাদা সমাধান না আসা পর্যন্ত অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ স্থলপথ ব্যবহার করতে হতে পারে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক aviation sanctions কীভাবে একটি এয়ারলাইন্সের বাইরেও পুরো supply chain-কে প্রভাবিত করতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য শুধু aircraft ও crew থাকাই যথেষ্ট নয়। বিদেশি বিমানবন্দরে ground handling, fuel, maintenance, catering, payment processing এবং অন্যান্য airport service প্রয়োজন হয়।
কোনো এয়ারলাইন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লে সেই এয়ারলাইনকে সেবা দেওয়া তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানও sanctions exposure নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে।
ফলে কোনো দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আকাশসীমা বন্ধ না করলেও commercial service provider সরে গেলে বাস্তবে ফ্লাইট পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইরাকের ক্ষেত্রে এমন ground-handling জটিলতাই ইরানি এয়ারলাইন্সের কার্যক্রমে বড় বাধা তৈরি করেছিল বলে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে।
নাজাফে ইরানি এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম সম্প্রসারণ হলে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা পাবেন ধর্মীয় পর্যটক ও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ।
ফ্লাইট বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রীকে ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ের স্থলযাত্রার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
সরাসরি বিমান যোগাযোগ বাড়লে সেই চাপ কমতে পারে।
তবে নাজাফের সমাধান ইরান-ইরাক aviation connectivity পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সমতুল্য নয়। বাগদাদসহ অন্য বিমানবন্দরগুলোর পরিস্থিতি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ প্রয়োগের ওপর দুই দেশের বিমান যোগাযোগের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে।
আপাতত নাজাফের জন্য পাওয়া বিশেষ ব্যবস্থা ধর্মীয় ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ aviation lifeline ফিরিয়ে দিচ্ছে—একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক বিরোধ কীভাবে সরাসরি বেসামরিক বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের ভ্রমণকে প্রভাবিত করতে পারে।
সূত্র: Al Jazeera
মন্তব্য করুন