এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ স্বল্পতা কাটাতে বড় পরিসরে বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি বছর দুই দফায় ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এসব তথ্য জানান। একই দিনে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে এয়ারবাসের সঙ্গে চলমান আলোচনার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, গত ৩০ এপ্রিল বিমান প্রথম দফায় ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করে। ওই ক্রয়াদেশে ছিল আটটি Boeing 787-10, দুটি 787-9 এবং চারটি 737-8। বোয়িংয়ের নিজস্ব ঘোষণাতেও এই মডেল ও সংখ্যার তথ্য রয়েছে।
এরপর আগের চুক্তির অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ ব্যবহার করে গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আরও ১১টি বোয়িংয়ের সম্পূরক চুক্তি করা হয়। দ্বিতীয় দফার ক্রয়াদেশে রয়েছে পাঁচটি Boeing 787-10 এবং ছয়টি Boeing 737-8। বোয়িংও ২৩ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্ডারের ঘোষণা দেয়।
দুই চুক্তি মিলিয়ে বিমানের অর্ডার দাঁড়িয়েছে ২৫টি বোয়িংয়ে। এর মধ্যে ১৩টি 787-10 ও দুটি 787-9—অর্থাৎ মোট ১৫টি wide-body; আর ১০টি 737-8 narrow-body উড়োজাহাজ।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির বর্তমান ডেলিভারি সূচিতে প্রথম উড়োজাহাজ পাওয়ার কথা ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং পর্যায়ক্রমে সর্বশেষটি ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহের কথা রয়েছে। তবে বর্তমান উড়োজাহাজ সংকট বিবেচনায় সরকার ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে অন্তত একটি উড়োজাহাজ আগাম সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে।
এর আগে এপ্রিলের ১৪ উড়োজাহাজের অর্ডারের ক্ষেত্রেও ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সরবরাহের পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
শুধু বোয়িং নয়, একটি টেকসই mixed fleet গড়ে তোলার পরিকল্পনায় এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছে সরকার।
মন্ত্রী জানান, চারটি Airbus A350-900 wide-body এবং ছয়টি A321neo narrow-body—মোট ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ের পর প্রকাশিত তথ্যেও একই মডেল ও সংখ্যার কথা জানানো হয়েছে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বোয়িংয়ের ২৫টির পাশাপাশি এয়ারবাসের ১০টি মিলিয়ে বিমানের বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৩৫টিতে। তবে এয়ারবাসের ক্ষেত্রে এখনো আলোচনা চলমান; চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। প্রকাশিত তথ্যে অক্টোবরে এ বিষয়ে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, বিমানের Network Fleet Planning, উড়োজাহাজের range ও যাত্রী ধারণক্ষমতা, সম্ভাব্য যাত্রী এবং সাপ্তাহিক ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্লেষণ করে wide-body ও narrow-body উড়োজাহাজের প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, wide-body উড়োজাহাজ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চ চাহিদার রুট এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘপাল্লার রুটে ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে narrow-body উড়োজাহাজ আঞ্চলিক ও তুলনামূলক স্বল্প দূরত্বের রুটে ব্যবহারের পাশাপাশি বিমানের পুরোনো 737-800 বহর প্রতিস্থাপনে ভূমিকা রাখবে।
বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, 787-10 উচ্চ যাত্রী চাহিদার রুটে অতিরিক্ত সক্ষমতা দেবে এবং 737-8 বিমানের single-aisle বহর আধুনিকায়নে ব্যবহৃত হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এপ্রিলেও প্রকাশিত বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় একই সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বহর ৪৭ উড়োজাহাজে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী দাবি করেন, বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন চাহিদার ২০ শতাংশের কিছু বেশি বর্তমানে বিমান বহন করছে এবং বাকি বাজারের বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইনের হাতে রয়েছে। এই বাজার-শেয়ার দাবিটি মন্ত্রীর বক্তব্য; প্রকাশিত বোয়িং অর্ডার-সংক্রান্ত নথিতে এর স্বাধীন পরিসংখ্যানগত যাচাই পাওয়া যায়নি।
সরকারের লক্ষ্য হলো নতুন উড়োজাহাজের মাধ্যমে বিমানের সক্ষমতা বাড়িয়ে ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মোকাবিলা, নতুন গন্তব্য চালু এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
বোয়িংয়ের বড় ক্রয়াদেশের পেছনে ভূরাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্তটি বিমানের নিজস্ব fleet planning ও যাত্রী চাহিদার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রভাব নেই।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বোয়িং ক্রয়াদেশকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাণিজ্য সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। Reuters এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক আলোচনার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এমন ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বহর সম্প্রসারণকে পরিচালনাগত প্রয়োজনের সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। Reuters
অর্থায়নের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিমান একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং নিজস্ব আয় ও উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে উড়োজাহাজ কেনার অর্থ পরিশোধ করা হবে।
সব উড়োজাহাজ একসঙ্গে সরবরাহ না হয়ে কয়েক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে আসায় অর্থ পরিশোধও ধাপে ধাপে হবে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানের আর্থিক সক্ষমতা, রুট থেকে আয় এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাটি করা হয়েছে। ফলে সরকারের বাজেটের ওপর সরাসরি এককালীন চাপ পড়বে না বলে তিনি মনে করেন।
বোয়িংয়ের ২৫ উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ এবং সম্ভাব্য ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে এটি বিমানের বহর ও নেটওয়ার্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে অর্থায়ন, নির্ধারিত সময়ে উড়োজাহাজ সরবরাহ, নতুন রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা এবং অতিরিক্ত বহরকে লাভজনকভাবে পরিচালনার সক্ষমতার ওপর।
তথ্যসূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং
মন্তব্য করুন