এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের ককপিটে সহ-পাইলটের হামলার ঘটনায় তদন্তের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশটির তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের দাবি, ২৯ বছর বয়সী এক ওমানি সহ-পাইলট দুবাই থেকে ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনার অভিযোগও আনা হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ইউএইর অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসির দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তদন্তের এসব তথ্য প্রকাশিত হয়। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি আকস্মিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর পেছনে পূর্বপরিকল্পিত উদ্দেশ্য থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারীরা দাবি করেছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে। দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া উড়োজাহাজটিতে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউএই কর্তৃপক্ষের তদন্ত অনুযায়ী, উড্ডয়নের পর উড়োজাহাজটির ককপিটে সহ-পাইলট ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা চালান। এতে ক্যাপ্টেন গুরুতর আহত হন এবং উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এ সময় উড়োজাহাজে থাকা অন্য পাইলট, কেবিন ক্রু এবং কয়েকজন যাত্রী পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সন্দেহভাজন সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরে বিকল্প পাইলটরা উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করেন।
ঘটনাটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে ককপিটের নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ক্রুদের সমন্বিত ভূমিকার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে।
ইউএইর অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনাল লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ পেয়েছেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তিনি আগের দুটি ফ্লাইটে তেল আবিবে গিয়ে উড়োজাহাজের রুট ও বিমানবন্দর সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিজের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন এবং একাই কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন।
তবে এসব তথ্য তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের আগে অভিযোগগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তদন্তকারীদের দাবি, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে পড়াশোনার সময় চরমপন্থী মতাদর্শের সংস্পর্শে আসেন। পরবর্তী সময়ে অনলাইন উপকরণ ও চরমপন্থী প্রচারণার মাধ্যমে তাঁর মধ্যে সহিংস মতাদর্শের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও তদন্তে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তবে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত ইতিহাসের কোন বিষয়গুলো হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তা নির্ধারণে আরও তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঘটনার পর বিমান সংস্থাগুলোর কর্মী নিয়োগ, পাইলটদের পেশাগত যোগ্যতা যাচাই এবং নিরাপত্তা পরীক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইউএই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। তাদের দাবি, সন্দেহভাজন ব্যক্তি প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা ও নিয়োগসংক্রান্ত নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করেছিলেন। তবে এসব যাচাইয়ের সময় তাঁর চরমপন্থী মতাদর্শ বা এমন হামলার পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত শনাক্ত করা যায়নি।
এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে—প্রচলিত নিয়োগ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের মাধ্যমে কর্মীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব?
ঘটনার পর ইসরায়েলে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট পরিচালনার নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবও ঘটনাটির বিমান নিরাপত্তাসংক্রান্ত তদন্ত শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট তদন্তে উড়োজাহাজের গতিপথ, জরুরি পরিস্থিতিতে পাইলটদের ভূমিকা এবং নিরাপদ অবতরণের প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ধরনের তদন্তের উদ্দেশ্য হলো ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চিহ্নিত করা।
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটের ঘটনাটি দেখিয়েছে, আকাশপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নয়, কর্মীদের যাচাই, ককপিটের সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের পরবর্তী ফলাফল আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন।
মন্তব্য করুন