এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের স্থায়ী পদে কর্মরত প্রকৌশলীদের একটি অংশ বর্তমানে পাওয়া লাইসেন্স ও অথরাইজেশন ভাতা মাসিক সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে লাইসেন্সধারীদের বাইরে আরও কিছু কারিগরি কর্মীকে এই সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান ভাতার যৌক্তিকতা, যোগ্যতা, আওতা, বাস্তব প্রয়োগ এবং আর্থিক প্রভাব নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। এ জন্য ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকৌশলীদের বিশেষায়িত দক্ষতা ধরে রাখা ও পেশাগত লাইসেন্স বজায় রাখার জন্য ভাতার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। বিপরীতে প্রশ্ন উঠেছে—যে লাইসেন্স কোনো পদে দায়িত্ব পালনের অন্যতম পেশাগত যোগ্যতা, সেই লাইসেন্সের বিপরীতে নিয়মিত বেতন-ভাতার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বর্তমান কাঠামো কতটা যৌক্তিক এবং বিমান এর বিপরীতে কী সুবিধা পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানের স্থায়ী পদে কর্মরত কোনো কোনো প্রকৌশলী বেতন ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত পান। এর পাশাপাশি পেশাগত লাইসেন্স, অনুমোদন ও বিভিন্ন কারিগরি অথরাইজেশনের বিপরীতে পৃথক ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বর্তমানে এ খাতে একজন প্রকৌশলী মাসে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা পান বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকৌশলীদের একটি অংশ এই সীমা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে দাবি উত্থাপিত হওয়া মানেই ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন নয়। বিষয়টি এখন পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
লাইসেন্স ভাতার বর্তমান কাঠামো নিয়ে বিমানের ভেতরে দুটি ভিন্ন যুক্তি রয়েছে।
এক পক্ষের প্রশ্ন, কোনো নির্দিষ্ট প্রকৌশল পদে কাজ করার জন্য পেশাগত লাইসেন্স ও অনুমোদন যদি প্রয়োজনীয় যোগ্যতার অংশ হয়, তাহলে সেই একই যোগ্যতার বিপরীতে নিয়মিত বেতনের বাইরে পৃথক লাইসেন্স ভাতা দেওয়ার যৌক্তিকতা কী।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে এই সুবিধা চালু থাকায় কতজন সুবিধা পাচ্ছেন, কোন লাইসেন্সের বিপরীতে পাচ্ছেন, সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স বাস্তবে কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং এতে বিমানের বার্ষিক ব্যয় কত—এসব বিষয়ও মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে প্রকৌশলীদের যুক্তি হচ্ছে, এভিয়েশন প্রকৌশলের লাইসেন্স শুধু একবার অর্জন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স ও অথরাইজেশন কার্যকর রাখতে প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা, নির্দিষ্ট উড়োজাহাজে কারিগরি দক্ষতা এবং নিয়মিত পেশাগত সক্ষমতা বজায় রাখতে হয়।
তাদের মতে, এই বিশেষায়িত দক্ষতার বাজারমূল্য রয়েছে এবং দক্ষ লাইসেন্সধারী প্রকৌশলী ধরে রাখতেও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা প্রয়োজন।
বিমানের Engineering and Material Management অধিদপ্তর থেকে গত ১০ আগস্ট জারি করা এক অফিস আদেশে বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
পরিচালক (Engineering and Material Management) এয়ার কমোডর মো. মঞ্জুর-এ-আলম স্বাক্ষরিত আদেশে কমিটির কার্যপরিধিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
কমিটিকে বিদ্যমান লাইসেন্স, অনুমোদন ও অনুমতিপত্র-সংক্রান্ত ভাতার বিধান পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে Engineering Maintenance, Engineering Services, Engineering Planning, Quality Assurance, Component Maintenance এবং Biman Airlines Training Center (BATC)-এর আওতায় থাকা লাইসেন্স ও অনুমোদনধারীদের বিভিন্ন শ্রেণি চিহ্নিত করবে কমিটি।
বৈধ লাইসেন্স ও অনুমোদনধারী প্রকৌশলী, প্রশিক্ষক এবং অন্যান্য অনুমোদিত কারিগরি কর্মীদের মধ্যে কারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, সেটিও যাচাই করা হবে।
এ ছাড়া Accountable Manager, CAMO Manager, Maintenance Manager এবং Quality Manager-সহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভাতার আওতায় আনার বিষয়ও পর্যালোচনা করা হবে।
নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান, বিমানের সাংগঠনিক প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন শিল্পের প্রচলিত চর্চা বিবেচনায় নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও সমতাভিত্তিক নীতিমালার সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।
বিমানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, লাইসেন্সধারীদের পাশাপাশি লাইসেন্স নেই—এমন কিছু কারিগরি কর্মীকেও সুবিধাটির আওতায় আনার আগ্রহ রয়েছে।
এখানেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তার মতে, যাদের বৈধ লাইসেন্স নেই এবং উড়োজাহাজের Certificate of Release to Service (CRS) দেওয়ার ক্ষমতাও নেই, তাদের একই ধরনের লাইসেন্স বা টেকনিক্যাল ভাতার আওতায় আনার যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারিগরি কাজে যুক্ত থাকা এবং একটি উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সেটিকে পুনরায় সার্ভিসে ছাড়ার অনুমোদন দেওয়ার পেশাগত কর্তৃত্ব এক বিষয় নয়। ফলে ভাতার শ্রেণিবিন্যাসেও দায়িত্ব ও জবাবদিহির মাত্রা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একজন প্রকৌশলীর একাধিক উড়োজাহাজের লাইসেন্স থাকার বিপরীতে ভাতা দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তার দাবি, কোনো কোনো প্রকৌশলীর তিন বা চার ধরনের উড়োজাহাজের লাইসেন্স থাকলেও বাস্তবে তিনি নির্দিষ্ট একটি উড়োজাহাজ বা বহর নিয়ে কাজ করছেন।
এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে—লাইসেন্স অর্জনকে ভাতার ভিত্তি ধরা হবে, নাকি সেই লাইসেন্স বাস্তবে দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিষয়টি স্পষ্ট না করে একাধিক লাইসেন্সের বিপরীতে ভাতা বাড়ানো হলে বিমানের আর্থিক দায়ও বাড়তে পারে।
প্রকৌশলীদের লাইসেন্স ও অনুমোদন ভাতা বাড়ানোর আলোচনা নতুন নয়।
২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেতন ও ভাতাদি-সংক্রান্ত একটি কমিটির প্রস্তাবে একজন প্রকৌশলীর জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা মাসিক লাইসেন্স ভাতা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল।
ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিক লাইসেন্সের জন্য মাসে ১৫ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয়সহ পরবর্তী প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা বলা হয়।
একই উড়োজাহাজের জন্য B1.1 ও B2 লাইসেন্স একসঙ্গে থাকলে প্রাথমিক লাইসেন্সের জন্য ২০ হাজার এবং পরবর্তী লাইসেন্সের জন্য ১৫ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাব ছিল।
এ ছাড়া Shop Category Class-2 Authorization, PFI, Engine Ground Run এবং Engine Borescope Inspection-এর মতো বিশেষ কারিগরি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও পৃথক ভাতার সুপারিশ করা হয়েছিল।
এসব ক্ষেত্রে প্রথম অনুমোদনের জন্য সাত হাজার এবং পরবর্তী প্রতিটি অনুমোদনের জন্য চার হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
তবে এগুলো ছিল প্রস্তাবিত কাঠামো; বর্তমান কার্যকর ভাতার সঙ্গে প্রস্তাবটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের ওই প্রস্তাবে প্রকৌশলীদের অর্জিত কারিগরি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সকে রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সেবা দেওয়ার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এটি লাইসেন্সধারী প্রকৌশলীদের পেশাগত সক্ষমতায় বিনিয়োগের পক্ষে অন্যতম যুক্তি।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের সুবিধা থাকার পরও বিদেশি এয়ারলাইন্সকে কারিগরি ও সার্টিফিকেশন সেবা দেওয়ার পরিধি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ফলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা সম্ভাব্য আয়ের বিপরীতে বিমান বাস্তবে কত আয় করছে কিংবা কী পরিমাণ কারিগরি সুবিধা পাচ্ছে—সেটিও মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
আগের প্রস্তাবে কোনো উড়োজাহাজ বিমানের বহর থেকে phase-out হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অর্জিত প্রাথমিক লাইসেন্স ভাতা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অব্যাহত রাখার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল।
একই সঙ্গে কোনো উড়োজাহাজ বহর থেকে বাদ পড়ার কারণে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের ভিত্তিতে আগে অর্জিত পদমর্যাদা ও বেতন-ভাতা কমানো না করার প্রস্তাবও ছিল।
তবে অকার্যকর হয়ে যাওয়া লাইসেন্সের পরিবর্তে এক বছরের মধ্যে নতুন লাইসেন্স অর্জনের ব্যবস্থার কথাও ওই প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
এ ধরনের বিধানও বর্তমান পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ বহরের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৌশলীদের টাইপ-রেটিং ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজনও পরিবর্তিত হয়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, প্রকৌশলীদের নিয়মিত বেতনের বাইরে যে উদ্দেশ্যে লাইসেন্স ভাতা দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে সেই উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হচ্ছে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তার মতে, সংশ্লিষ্ট পদে চাকরির জন্য লাইসেন্স থাকা যদি আবশ্যিক যোগ্যতার অংশ হয়, তাহলে সেই একই লাইসেন্সের বিপরীতে পৃথক ভাতা দেওয়ার যৌক্তিকতাও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পর্যালোচনা করা উচিত।
তবে এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যয়ের হিসাব নয়, দক্ষ প্রকৌশলী ধরে রাখা, নিরাপদ রক্ষণাবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং লাইসেন্সধারী জনবলের মাধ্যমে বিমানের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ফলে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ভাতা বাড়ানো হবে কি না—শুধু সেই সিদ্ধান্তের চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কোন যোগ্যতা ও দায়িত্বের বিপরীতে ভাতা দেওয়া হবে, একজন কতগুলো লাইসেন্সের সুবিধা পাবেন এবং সেই ব্যয়ের বিপরীতে বিমান কী পরিমাপযোগ্য সুবিধা পাচ্ছে।
৯ সদস্যের কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশের পরই এসব প্রশ্নের বিষয়ে বিমানের পরবর্তী অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে।
সূত্র: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, পূর্ববর্তী ভাতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য
মন্তব্য করুন