এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকায় একই আমদানিকারকের দুটি চালান তল্লাশি করে ১ হাজার ১৬৭টি ল্যাপটপ ও ১০০টি ট্যাব-আইপ্যাডসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। চালান দুটিতে ঘোষিত মূল্য ছিল মাত্র ৫ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। কায়িক পরীক্ষা ও কাস্টমসের মূল্যায়নের পর পণ্যের সম্মিলিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৮৬ ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় মূল্যায়িত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ২১ হাজার ৫৭০ টাকা। অর্থাৎ আমদানির সময় ঘোষিত মূল্যের তুলনায় কাস্টমসের মূল্যায়িত মূল্য প্রায় ৩০ গুণ বেশি।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক পরীক্ষায় চালান দুটিতে মিথ্যা ঘোষণা, পরিমাণগত অসামঞ্জস্য, অস্বাভাবিক কম মূল্য ঘোষণা এবং ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, চালান দুটির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান Sardar Global Trade (BIN: 009113645-0111) এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট FAHIM 5 STAR LTD।
প্রথম চালানের AWB নম্বর 997-66890751 এবং সংশ্লিষ্ট B/E নম্বর 821186, তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৬।
এই চালানে আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্য ছিল মাত্র ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু কায়িক পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর পণ্যের সংশোধিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৫২৭ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ৮৫ হাজার ৫৮৪ টাকা।
কায়িক পরীক্ষায় প্রথম চালান থেকে ৫৪৩টি HP Core i5 এবং ১৮৭টি HP Core i3 ল্যাপটপ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া Mini PC হিসেবে ঘোষিত আরও ১০টি HP Core i5 ল্যাপটপ শনাক্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে চালানটিতে ৭৪০টি ল্যাপটপ এবং ৬০টি ট্যাব ও আইপ্যাড পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫৫টি ট্যাব ও পাঁচটি আইপ্যাড।
পরীক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘোষণার তুলনায় অতিরিক্ত ৪৩টি ল্যাপটপ পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় চালানের AWB নম্বর 997-60500451 এবং সংশ্লিষ্ট B/E নম্বর 821108, তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৬।
এই চালানে ঘোষিত মূল্য ছিল ২ হাজার মার্কিন ডলার। কায়িক পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর সংশোধিত মূল্য দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ২৫৯ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ৯৮৬ টাকা।
চালানটিতে ৪৬টি Core i3 এবং ৩৮১টি Core i5 মিলিয়ে মোট ৪২৭টি ল্যাপটপ পাওয়া যায়।
পাশাপাশি পাওয়া যায় ৩৫টি ট্যাব ও পাঁচটি আইপ্যাড। পরীক্ষণ প্রতিবেদনে ঘোষণার তুলনায় অতিরিক্ত ৩৯টি ল্যাপটপ পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই চালান মিলিয়ে ঘোষণার অতিরিক্ত ল্যাপটপের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২টি।
দুই চালানের কায়িক পরীক্ষায় সর্বমোট ১ হাজার ১৬৭টি ল্যাপটপ এবং ১০০টি ট্যাব ও আইপ্যাড পাওয়া গেছে।
এর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গাড়ির যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য পণ্যও শনাক্ত করা হয়েছে।
কাস্টমসের পরীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ল্যাপটপের বাহ্যিক অবস্থা দেখে সেগুলো ব্যবহৃত (Used) হতে পারে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে “could be used as per external appearance” উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু বাহ্যিক অবস্থা বিবেচনায় পণ্যগুলোকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহৃত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে—এমনটি নয়। বিষয়টি পরবর্তী যাচাই ও আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রচলিত আমদানি নীতির আওতায় এসব পণ্যের আমদানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষ যাচাই করছে।
চালান দুটির আরও কিছু পণ্যের ঘোষণার ক্ষেত্রেও অসামঞ্জস্য পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা।
Capacitor, Rubber Seal O-ring, Gasket Rubber ও Fittings হিসেবে ঘোষিত কিছু পণ্য কায়িক পরীক্ষায় গাড়ির যন্ত্রাংশ (Car Parts) হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বলে পরীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এসব পণ্যের প্রকৃত বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট HS Code পরিবর্তনের বিষয়টিও পরীক্ষায় উঠে এসেছে।
পণ্যের সঠিক HS Code নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ওপর প্রযোজ্য শুল্ক-কর, আমদানি শর্ত এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক বিধান নির্ভর করতে পারে।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৩ আগস্ট চালান দুটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
এরপর ২৩ আগস্ট সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চালান দুটির কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
পরীক্ষায় পণ্যের ঘোষণা, সংখ্যা ও মূল্যায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
কাস্টমস গোয়েন্দার তথ্য অনুযায়ী, মিথ্যা ঘোষণা, অস্বাভাবিক কম মূল্য ঘোষণা, ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানি, পণ্যের প্রকৃত তথ্য গোপন এবং সম্ভাব্য আমদানি-নিষিদ্ধ ব্যবহৃত পণ্য আনার অভিযোগ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং প্রযোজ্য আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তবে বিষয়টি এখনো আইনগত প্রক্রিয়াধীন। ফলে আমদানিকারক বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো পক্ষকে চূড়ান্তভাবে শুল্ক ফাঁকি বা অন্য কোনো অপরাধে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকায় শুল্ক-কর ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা এবং নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)
মন্তব্য করুন