বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ সম্প্রসারণে নতুন মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে নতুন দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি (এয়ার সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরের ফলে সপ্তাহে যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদিত সংখ্যা ৪৯টি থেকে বাড়িয়ে ৮৫টি করা হয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে সপ্তাহে অতিরিক্ত ৩৬টি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের কাছে সপ্তাহে অতিরিক্ত ৩৬টি ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ এতে সম্মতি দেওয়ার পর নতুন চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনাসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সৌদি আরব সফররত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ হাসান সিদ্দিক আমাদের সময়কে বলেন, আগে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সপ্তাহে ৪৯টি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি ছিল। নতুন চুক্তিতে তা বাড়িয়ে ৮৫টি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ফ্লাইট বাড়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত আরও সহজ হবে। টিকিটের সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ কমবে। পাশাপাশি হজ ও ওমরাহ ফ্লাইট পরিচালনায় দীর্ঘদিনের বিভিন্ন জটিলতা নিরসনেও নতুন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
বেবিচক চেয়ারম্যান জানান, গত ৩ আগস্ট তাঁর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সৌদি আরব সফরে যায়। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষে নতুন চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়।
অতিরিক্ত ফ্লাইট চালুর সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশ–সৌদি আরব রুটে দীর্ঘদিনের টিকিট সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাহিদার বিপরীতে আসনসংখ্যা বাড়লে টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যও সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। এতে সৌদি আরবে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর পাশাপাশি হজ ও ওমরাহযাত্রী এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীরা সহজ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
নতুন চুক্তিতে হজ মৌসুমে ফ্লাইট পরিচালনার জটিলতা নিরসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবছর হজের সময় শেষ মুহূর্তে স্লট সংকট, ফ্লাইট পুনঃতফসিল এবং অন্যান্য পরিচালনাগত সমস্যার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব সমস্যা কমিয়ে আনতে কার্যকর ও স্থিতিশীল স্লট ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলো, বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে সুবিধাজনক সময়ে অবতরণ ও উড্ডয়নের স্লট পেতে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গভীর রাত বা অনুপযুক্ত সময়ে স্লট পাওয়ায় একদিকে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে যাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়।
এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল সৌদি আরবের স্লট নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ সৌদি স্লট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধিরা তাদের পরিচালনগত সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য আরও বাস্তবসম্মত ও সুবিধাজনক সময়সূচি নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, “বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আকাশপথের যোগাযোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই চুক্তি বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের যাতায়াত আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করবে।”
এদিকে কম খরচে হজযাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত ফ্লাইট ও প্রয়োজনীয় স্লট নিশ্চিত হলে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর সৌদি আরবের বাজারে কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।
একই সঙ্গে এ রুটে বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে যাত্রীভাড়া কমার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। এতে প্রবাসী ও হজ-ওমরাহযাত্রীদের ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশীয় বিমান সংস্থার মাধ্যমে বেশি যাত্রী পরিবহন করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন