এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
ইতালির রোমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টরন্টো–ঢাকা রুটের ফ্লাইট বিজি-৩০৬ জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের দীর্ঘ ভোগান্তির ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বোসরা ইসলামকে ওই বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মহাব্যবস্থাপকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিমান সূত্র জানায়, ফ্লাইটটি রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের পর জনসংযোগ বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি ও যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি—এমন অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর বুধবার (১২ আগস্ট) বোসরা ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়।
তার জায়গায় বিমানের করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিনকে জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্ত শুধু জনসংযোগ বিভাগের ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফ্লাইট পরিচালনা, জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত, যাত্রী ব্যবস্থাপনা, খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা, যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংকটের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
টরন্টো থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩০৬ যান্ত্রিক সমস্যার কারণে রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। এরপর ভিসা জটিলতায় প্রায় ১৭০ বাংলাদেশি যাত্রীকে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরের লাউঞ্জে অবস্থান করতে হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ, তাদের অনেককে চেয়ার ও মেঝেতে রাত কাটাতে হয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাসপোর্টধারী কিছু যাত্রীকে বিমানবন্দরের বাইরে হোটেলে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ফ্লাইটের যাত্রীদের স্বজনদের একজন লিগ্যাল ইকোনমিস্ট এমএস সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, ঘটনার শুরু থেকেই যাত্রীদের সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি। কখনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমস্যা, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি এবং পরে আগুনের বিষয় সামনে আসায় যাত্রী ও স্বজনদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় আটকে থাকা যাত্রীদের পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় শুধু জনসংযোগ বিভাগ নয়, বিমানের ব্যবস্থাপনা ও ফ্লাইট পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিমানটির ত্রুটি মেরামতের জন্য ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ রোমে পাঠানো হয়। মেরামত শেষে স্থানীয় সময় শনিবার রাতে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় এবং রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঢাকায় পৌঁছায়।
দেশে ফেরার পর বেশ কয়েকজন যাত্রী তাদের দীর্ঘ ভোগান্তির বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন। খাবার, বিশ্রাম, তথ্য সরবরাহ এবং দেশে ফেরার সময় নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেন ফ্লাইটটি জরুরি অবতরণ করেছিল, এরপর যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে থাকতে হলো কেন, তাদের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং সংকটের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথ ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ক্রু সদস্যসহ ফ্লাইট পরিচালনা ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে সঠিক ও সময়মতো তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট সূত্র বোসরা ইসলামকে জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায় নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বোসরা ইসলামের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
রোমের এই ঘটনায় বিমানের যাত্রীসেবা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার জন্য কার কী ধরনের দায় ছিল, তা আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্র: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস
মন্তব্য করুন