aviation
প্রকাশিত: 4 October 2026, 7:11:47 Pm
অনলাইন সংস্করণ

বিমানবন্দরের আকাশপথে ঝুঁকি: উচ্চতা-সীমা লঙ্ঘন করে নির্মিত ৬৪০-এর বেশি ভবন চিহ্নিত

এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও তেজগাঁও বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ ওঠানামার গুরুত্বপূর্ণ এলাকার আশপাশে নির্ধারিত উচ্চতা-সীমা লঙ্ঘন করে নির্মিত ৬৪০টির বেশি ভবন ও স্থাপনা শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটির মতে, এসব স্থাপনা নিরাপদ বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য obstacle বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পর্যবেক্ষণ ও নথিতে এসব স্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সাল থেকে প্রস্তুত করা বিভিন্ন নথিতে অন্তত ৩২৫টি ভবনের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩২৫টি ভবনের মধ্যে ২০২টি তেজগাঁও বিমানবন্দর এবং ১২৩টি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট সুরক্ষিত আকাশসীমা ও উচ্চতা নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে রয়েছে।

তালিকায় শুধু আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন নয়; সরকারি স্থাপনা, হাসপাতাল, হোটেল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোথাও সীমার চেয়ে ৭০–৮০ ফুট পর্যন্ত বেশি

নথিপত্র অনুযায়ী, উচ্চতা লঙ্ঘনের মাত্রাও সব ভবনের ক্ষেত্রে এক নয়।

কোনো কোনো স্থাপনা অনুমোদিত উচ্চতার তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ ফুট বেশি, আবার কিছু ভবনের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ৭০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে উত্তরার বাউনিয়া ও উত্তরা-১২ এলাকার একাধিক ভবন নির্ধারিত উচ্চতা অতিক্রম করেছে বলে বেবিচকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

কিছু স্থাপনা এমন এলাকাতেও নির্মিত হয়েছে, যেগুলো নথিতে নিষিদ্ধ বা ‘Red Zone’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রে শুধু ভবনটি কততলা, সেটিই বিবেচ্য নয়। বিমানবন্দর থেকে এর দূরত্ব, ভূমির উচ্চতা, runway-এর সঙ্গে অবস্থান এবং উড়োজাহাজের approach ও departure path-এর সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনা করে গ্রহণযোগ্য উচ্চতা নির্ধারিত হয়।

কেন বিমানবন্দরের পাশে ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়

বিমানবন্দরের চারপাশের সব জায়গায় একই উচ্চতায় ভবন নির্মাণ করা যায় না। নিরাপদে উড়োজাহাজ ওঠানামার জন্য runway-কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন imaginary surface বা সীমা নির্ধারণ করা হয়, যা aviation terminology-তে Obstacle Limitation Surfaces (OLS)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

সহজভাবে বললে, runway-এর দিকে উড়োজাহাজ নামা বা সেখান থেকে উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় আকাশপথকে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা থেকে নিরাপদ রাখতেই নির্দিষ্ট এলাকায় ভবন ও অন্যান্য স্থাপনার উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এ কারণেই বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি ভবনের গ্রহণযোগ্য উচ্চতা অন্য এলাকার একই ধরনের ভবনের তুলনায় কম হতে পারে।

তাই শুধু ভবনের মোট উচ্চতা দেখে কোনো স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা যায় না; সংশ্লিষ্ট স্থানের জন্য অনুমোদিত aviation height limitation-এর সঙ্গে সেটির প্রকৃত উচ্চতা তুলনা করতে হয়।

এক দশক ধরে রাজউককে চিঠি দেওয়ার তথ্য

বেবিচক জানিয়েছে, উচ্চতা-সীমা অতিক্রম করা বিভিন্ন স্থাপনার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) অবহিত করা হচ্ছে।

সংস্থাটির দাবি, বিধিমালা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার রাজউককে চিঠি দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিষয়টি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বেবিচকের নথি অনুযায়ী, ওই দুর্ঘটনার আগের কয়েক মাসেও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার বিষয়ে রাজউককে একাধিকবার জানানো হয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অন্তত ছয়টি চিঠিতে ১৭টি অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ভবনের উচ্চতা লঙ্ঘনের সঙ্গে অতীতের কোনো বিমান দুর্ঘটনার সরাসরি কারণগত সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। উচ্চতা-সীমা লঙ্ঘনের বিষয়টি এখানে পৃথক aviation safety concern হিসেবে বিবেচ্য।

NOC নেওয়ার পরও অতিরিক্ত তলা নির্মাণের অভিযোগ

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অনেক ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় বেবিচকের প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র বা NOC নেওয়া হয়েছিল।

সমস্যা তৈরি হয়েছে পরবর্তী পর্যায়ে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক ভবন মালিক অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে পরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করেছেন।

তিনি এ ক্ষেত্রে তদারকি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছেন।

এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ regulatory gap সামনে নিয়ে আসে। কারণ কোনো ভবন নির্মাণের আগে aviation clearance নেওয়া হলেও নির্মাণ শেষে ভবনটি অনুমোদিত উচ্চতার মধ্যেই রয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নজরদারিও প্রয়োজন।

৬৪০টির বেশি বনাম ৩২৫ ভবন—পার্থক্য কোথায়

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে উচ্চতা-সীমা লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত ৬৪০টির বেশি ভবন ও স্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে ২০১৫ সাল থেকে প্রস্তুত করা বিভিন্ন নথিতে ৩২৫টি ভবনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে—যার মধ্যে ২০২টি তেজগাঁও এবং ১২৩টি শাহজালাল বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট এলাকায়।

ফলে দুটি সংখ্যাকে একই তালিকার সংখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ৬৪০-এর বেশি সংখ্যাটি বিস্তৃত সময়ের মধ্যে শনাক্ত স্থাপনার সামগ্রিক হিসাব, আর ৩২৫টি ভবনের ক্ষেত্রে বিস্তারিত নথিভুক্ত তথ্যের কথা বলা হয়েছে।

Obstacle Database হালনাগাদেও জটিলতা

উচ্চতা-সীমা অতিক্রম করা ভবনের বিষয়টি শুধু সরাসরি physical obstacle-এর প্রশ্ন নয়। বেবিচকের মতে, এসব অননুমোদিত স্থাপনার কারণে নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় Obstacle Database হালনাগাদ করতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

একটি বিমানবন্দরের আশপাশে কোথায় কী ধরনের উঁচু স্থাপনা, টাওয়ার বা অন্য প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এসব তথ্য flight procedure ও aviation safety planning-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

শহরের ভবনের উচ্চতা দ্রুত পরিবর্তিত হলেও সেই তথ্য যথাসময়ে aviation database-এ প্রতিফলিত না হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ আরও জটিল হয়ে পড়ে।

যৌথ জরিপে নামছে বেবিচক ও রাজউক

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেবিচক ও রাজউক যৌথভাবে জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদনবহির্ভূত ভবনগুলো শনাক্ত করা হবে। এরপর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনুমোদনের বাইরে নির্মিত অংশ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।

এই যৌথ জরিপ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি ভবনের aviation height clearance এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের building approval—দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব এক নয়।

তাই অনুমোদনের সময় NOC যাচাইয়ের পাশাপাশি নির্মাণ শেষে বাস্তবে কতটুকু উচ্চতা তৈরি হয়েছে, সেটিও সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

জননিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের মধ্যে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে runway-এর আশপাশের ভূমি ব্যবহার ও ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, aviation safety নিশ্চিত করতে শুধু বিমান, পাইলট, runway বা Air Traffic Control-এর নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়। বিমানবন্দরের চারপাশের obstacle environment-ও নিরাপদ রাখতে হয়।

এ কারণে অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত তলা নির্মাণকে কেবল নগর পরিকল্পনার অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বিমানবন্দরের নির্ধারিত height restriction লঙ্ঘিত হলে বিষয়টি aviation safety-এর সঙ্গেও যুক্ত হয়।

বেবিচক ও রাজউকের পরিকল্পিত যৌথ জরিপ এখন কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং শনাক্ত স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ রাজধানীর দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপদ আকাশপথের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে শুধু ভবন নির্মাণের সময় অনুমোদন দেওয়া নয়—অনুমোদিত উচ্চতা বাস্তবে মানা হচ্ছে কি না, তার ধারাবাহিক নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগও প্রয়োজন।

সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার সেবায় যাত্রা শুরু করল আকিজ গ্রুপ

1

আজ থেকে শুরু বেবিচকের ৮৯০ পদে আবেদন, চলবে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত

2

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এভিয়েশন সক্ষমতার উজ্জ্বল প্রতি

3

২৫ আগস্ট প্রস্তাব দেবে জাপানি কনসোর্টিয়াম, সেপ্টেম্বরের শেষে

4

দম্মামের বাদশাহ ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্

5

সমুদ্রের নিচে বোয়িং ৭৪৭, বাহরাইনে উড়োজাহাজই এখন ডাইভিং আকর্ষ

6

ইস্তাম্বুলে তুর্কিশ এয়ারলাইনস কর্মীদের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি প্রধ

7

জাল ভিসা ধরা পড়তেই উধাও ৬১ যাত্রী, মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইট ঘিরে

8

বাংলাদেশ-সৌদি বিমান যোগাযোগে নতুন মাইলফলক, এভিয়েশন কূটনীতিতে

9

ভারতকে বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ ক

10

বিশেষ ফ্লাইটে লিবিয়া থেকে ফিরছেন আরও ৩০০ বাংলাদেশি

11

শাহজালাল বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছ

12

জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটি (NCASC) পুনর্গঠন

13

তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পেতে প্রতিযো

14

শাহজালালে ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখ টাকার পণ্য আ

15

৭ অক্টোবর এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পথে বিমান, বহর

16

বিদেশগমনেচ্ছুদের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান বোয়েসেলের

17

নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান পর্যটন মন্ত্

18

বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সে চাকরির নামে প্রতারণা থেকে সতর্ক থাক

19

সৌদি বিমানবন্দরে হামলা: রিয়াদ ও দাম্মাম রুটে বিমানের ফ্লাইট

20