এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে কাজ করার জন্য চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় রেখেছে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত ছাড়পত্রের জন্য বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে নাম জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান চারটি হলো যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন (Menzies Aviation), সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট (Swissport), তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং (Çelebi Aviation Holding) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিনাটা (dnata)।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খানের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বেবিচক যাচাই করবে, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এমন কোনো নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক বা অন্যান্য আপত্তি রয়েছে কি না, যা বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা হতে পারে।
যাচাই শেষে ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করবে জাপানি কনসোর্টিয়াম। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স দেবে বেবিচক।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৃতীয় টার্মিনালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি যাত্রীসংশ্লিষ্ট গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা পরিচালনা করবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব এককভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছেই থাকবে।
বাসসের প্রতিবেদনে তুলে ধরা তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, মেনজিস এভিয়েশন বিশ্বের ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। সুইসপোর্ট প্রায় ৪৪ থেকে ৪৯টি দেশের ৩১০টি বিমানবন্দরে, ডিনাটা ৩৫টি দেশের ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থাপনায় এবং চেলেবি পাঁচটি দেশের ৬০টির বেশি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর্মী প্রশিক্ষণ ও সেবার মান তৃতীয় টার্মিনালের জন্য অপারেটর নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেনজিস এভিয়েশনের বাংলাদেশকেন্দ্রিক প্রস্তাবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচিত হলে প্রথম বছরে ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এ অর্থ গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট, প্রযুক্তি, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, যার প্রায় ৯৯ শতাংশ কর্মী বাংলাদেশি হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আনুমানিক সাড়ে চার হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবন্দর এলাকায় প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও এভিয়েশন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার পরিকল্পনাও জানিয়েছে মেনজিস।
তবে এসব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের হিসাব প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত পরিকল্পনা; এখনো চূড়ান্ত অনুমোদিত কার্যক্রম নয়।
আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা নিশ্চিত করতে ব্যাগেজ সরবরাহ, চেক-ইন, যাত্রী সহায়তা, র্যাম্প অপারেশন এবং উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংশ্লিষ্ট শিল্প আলোচনায় প্রথম ব্যাগেজ প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং শেষ ব্যাগেজ প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের মতো সেবামানের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
গত মাসে বাংলাদেশ সফরকালে মেনজিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচিত হলে বড় উড়োজাহাজের প্রথম ব্যাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং শেষ ব্যাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। এ জন্য ডিজিটাল ব্যাগেজ ট্র্যাকিং ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবার মান যাচাইয়ে শুধু প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতির উপস্থিতি নয়, বরং বাস্তবে ব্যাগেজ সরবরাহের সময়, উড়োজাহাজ পরিচালনার নিরাপত্তা, কর্মীদের দক্ষতা এবং নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমানের মতে, তৃতীয় টার্মিনালের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ অপারেটর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ স্থানীয় জনবলের দক্ষতা উন্নয়নেও সহায়ক হতে পারে।
এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করছেন, একই টার্মিনালে দুটি অপারেটর থাকলে সেবার মান ও পরিচালন দক্ষতার তুলনামূলক মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, তৃতীয় টার্মিনালের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং এক হাজারের বেশি অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে।
তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেড, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্বিতীয় প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নির্বাচন তৃতীয় টার্মিনালকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, লাইসেন্স প্রদান এবং কার্যক্রম শুরুর সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
মন্তব্য করুন