সাধারণ যাত্রীদের কাছে উড়োজাহাজ ভ্রমণ বলতে মূলত নির্ধারিত সময়সূচির বাণিজ্যিক ফ্লাইটই পরিচিত। কিন্তু এর বাইরে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে পুরো একটি উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টার নির্দিষ্ট যাত্রার জন্য ভাড়া নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ফ্লাইটই সাধারণভাবে চার্টার্ড ফ্লাইট (Charter Flight) নামে পরিচিত।
বাংলাদেশেও চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক সফর থেকে শুরু করে জরুরি চিকিৎসা, করপোরেট ভ্রমণ, পর্যটন, বিশেষ প্রতিনিধি দল কিংবা আন্তর্জাতিক যাত্রায় প্রয়োজন অনুযায়ী চার্টার সেবা নেওয়া যায়। তবে সাধারণ এয়ার টিকিট কেনার মতো চার্টার ফ্লাইট বুকিংয়ের প্রক্রিয়া নয়; উড়োজাহাজ, রুট ও ফ্লাইটের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজন হয় অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের।
নির্ধারিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট একটি প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যাত্রীরা আলাদাভাবে আসন কেনেন। চার্টার ফ্লাইটে সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়, গন্তব্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী একটি উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারের পুরো বা নির্ধারিত সক্ষমতা ভাড়া নেয়।
চার্টার সেবা ব্যবসায়িক সফর, মেডিকেল ইভাকুয়েশন বা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, করপোরেট টিম পরিবহন, পর্যটন, বিশেষ অনুষ্ঠান, ক্রীড়া দল কিংবা সময়-সংবেদনশীল যাত্রায় ব্যবহার হতে পারে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ব্যবস্থায় Non-Schedule Flight Permit-এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। বেবিচকের ই-সেবার তালিকাতেও Non Schedule Flight Permits অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রথমে যাত্রীকে একটি অনুমোদিত এয়ার অপারেটর বা চার্টার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে যাত্রার তারিখ, সম্ভাব্য সময়, কোথা থেকে কোথায় যেতে চান, যাত্রীর সংখ্যা, যাত্রার উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজনীয় বিশেষ সেবার তথ্য জানাতে হয়।
এরপর অপারেটর যাত্রার জন্য উপযুক্ত উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টার, ফ্লাইটের সম্ভাব্য সময়সূচি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং খরচ নির্ধারণ করে প্রস্তাব দিতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে NOVOAIR-এর Charter Service-এ বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যে চার্টার সেবার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাদের প্রকাশিত শর্ত অনুযায়ী বুকিং নিশ্চিত করতে ৫০ শতাংশ অগ্রিম এবং বাকি অর্থ যাত্রার সাত কার্যদিবস আগে পরিশোধের বিধান রয়েছে। VAT ও Tax আলাদাভাবে প্রযোজ্য বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
অন্যদিকে Square Air চার্টার ও মেডিকেল/ইমার্জেন্সি ফ্লাইট সেবা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ফ্লাইটের জন্য সাধারণভাবে তিন কার্যদিবস আগে রিকুইজিশন দিতে হয়। সেখানে ফ্লাইটের তারিখ ও সময়, উদ্দেশ্য, রুট ও গন্তব্য, যাত্রীদের নাম-ঠিকানা এবং পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের স্ক্যান কপি চাওয়া হয়।
দেশে হেলিকপ্টারভিত্তিক চার্টার সেবাও রয়েছে। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি দেশীয় অপারেটর নন-শিডিউলড চার্টার হেলিকপ্টার পরিচালনা করে।
চার্টার ফ্লাইট মানেই যাত্রী ইচ্ছামতো যেকোনো উড়োজাহাজ নিয়ে যেকোনো সময় উড়তে পারবেন—বিষয়টি এমন নয়। ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বেবিচকের বিধিবিধান, এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দর সুবিধা, নিরাপত্তা, আবহাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের বিষয় থাকে।
বিশেষ করে বিদেশি নিবন্ধিত উড়োজাহাজের নন-শিডিউলড বা চার্টার ফ্লাইট বাংলাদেশে প্রবেশ বা ট্রানজিটের ক্ষেত্রে পূর্বানুমতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের AIP-এ বিদেশি অপারেটরের এ ধরনের ফ্লাইটের আবেদনে অপারেটরের পরিচয়, উড়োজাহাজের ধরন ও রেজিস্ট্রেশন, আগমন-প্রস্থানের সময়, যাত্রার উদ্দেশ্য, যাত্রী বা কার্গোর তথ্য এবং রুটসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বেবিচকের বর্তমানে Non Schedule Flight Permits-এর জন্য অনলাইন ব্যবস্থাও রয়েছে।
চার্টার ফ্লাইটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সর্বজনীন ভাড়া নেই। উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারের ধরন, রুটের দূরত্ব, ফ্লাইং টাইম, গ্রাউন্ডে অপেক্ষার সময়, বিমানবন্দর চার্জ, জ্বালানি, কর, যাত্রীর সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট হলে বিভিন্ন দেশের অনুমতি ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ের ওপর মোট খরচ নির্ভর করে।
Square Air-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের চার্টার ফ্লাইটের চার্জ নির্ধারণে air time এবং ground time-এর সঙ্গে VAT ও SD বিবেচনা করা হয়।
তাই ঢাকা থেকে কক্সবাজারের একটি চার্টার ফ্লাইট এবং ঢাকা থেকে বিদেশের কোনো গন্তব্যে একটি প্রাইভেট জেট চার্টার করার খরচ এক হবে না। সঠিক খরচ জানতে নির্দিষ্ট রুট, তারিখ ও যাত্রীসংখ্যা দিয়ে অপারেটরের কাছ থেকে quotation নিতে হবে।
চার্টার ফ্লাইট শুধু ধনী ব্যক্তি বা ভিআইপিদের জন্য—এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। কোনো কোম্পানি তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একসঙ্গে পরিবহন, মেডিকেল প্রতিষ্ঠান রোগী স্থানান্তর, পর্যটন প্রতিষ্ঠান বিশেষ গ্রুপ পরিচালনা কিংবা ব্যক্তি ও পরিবার বিশেষ প্রয়োজনে চার্টার সেবা নিতে পারে।
বিশেষ করে সময়ের গুরুত্ব বেশি হলে অথবা নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে প্রয়োজনীয় রুট বা সময়সূচি না থাকলে চার্টার ফ্লাইট একটি বিকল্প হতে পারে।
চার্টার সেবা নেওয়ার আগে অপারেটরের বৈধতা ও প্রয়োজনীয় এভিয়েশন অনুমোদন যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি quotation-এ জ্বালানি, VAT/Tax, airport handling, landing/parking, ground waiting এবং cancellation charge অন্তর্ভুক্ত আছে কি না পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক চার্টারের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, ভিসা ও গন্তব্য দেশের প্রবেশসংক্রান্ত নিয়মও স্বাভাবিকভাবেই প্রযোজ্য থাকবে। চার্টার ফ্লাইট ব্যক্তিগতভাবে বুক করা হয়েছে বলে ইমিগ্রেশন বা রাষ্ট্রীয় প্রবেশবিধি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে চার্টার্ড ফ্লাইট পাওয়া সম্ভব হলেও এটি সাধারণ টিকিট বুকিংয়ের চেয়ে আলাদা একটি প্রক্রিয়া। যাত্রার পরিকল্পনা আগে থেকে করে অনুমোদিত অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অনুমতি নিশ্চিত করেই চার্টার ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
মন্তব্য করুন