এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বিদেশ থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে ব্যাগেজ বেল্টের সামনে অপেক্ষা করছেন। একে একে অন্য যাত্রীদের লাগেজ চলে এলেও আপনার স্যুটকেসটি আর এল না। এমন পরিস্থিতিতে অনেক যাত্রীই বুঝতে পারেন না—কোথায় যাবেন, কার কাছে অভিযোগ করবেন কিংবা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার আগে কী কী কাজ করতে হবে।
লাগেজ না পাওয়ার অর্থ সব সময় সেটি স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেছে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুল উড়োজাহাজে বা অন্য গন্তব্যে চলে যাওয়া, ট্রানজিট বিমানবন্দরে থেকে যাওয়া কিংবা লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের কারণে ব্যাগ নির্ধারিত ফ্লাইটে না আসতে পারে। তবে লাগেজ না পেলে দ্রুত সঠিক জায়গায় রিপোর্ট করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে আপনার ফ্লাইটের লাগেজ কোন বেল্টে আসছে সেটি ডিসপ্লে দেখে নিশ্চিত করুন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ইমিগ্রেশন শেষ করার পর ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে দেখে নির্ধারিত বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করতে হয়।
বেল্টে সব লাগেজ আসা শেষ হওয়ার পরও নিজের ব্যাগ না পেলে আশপাশে ভালোভাবে দেখে নিন। একই ধরনের ব্যাগ অন্য যাত্রী ভুল করে নিয়ে গেছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখুন।
এরপর দেরি না করে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের প্রতিনিধি এবং বিমানবন্দরের Lost and Found বিভাগে যোগাযোগ করুন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের Lost and Found ডেস্ক লাগেজ বেল্ট-১-এর কাছে রয়েছে। মূল Lost and Found অফিসটি নিচতলার Room No. 15, বিমানবন্দর ভবনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত।
চেকড-ইন লাগেজ না এলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের কাছে একটি Property Irregularity Report (PIR) করার প্রয়োজন হতে পারে। এটি হারানো বা বিলম্বিত লাগেজ খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নথি।
PIR করার সময় সাধারণত যাত্রীর নাম ও যোগাযোগের তথ্য, ফ্লাইট নম্বর, যাত্রার রুট, ব্যাগেজ ট্যাগ নম্বর এবং ব্যাগের রং, আকার, ব্র্যান্ড ও বিশেষ শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্যের মতো তথ্য প্রয়োজন হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও তাদের ব্যাগেজ নির্দেশনায় বলছে, চেকড লাগেজ বিলম্বিত, ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে গেলে পৌঁছানোর পর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে জানিয়ে অথবা Lost and Found বিভাগে গিয়ে দ্রুত রিপোর্ট করতে হবে। ব্যাগের রং, আকার ও শনাক্তকারী চিহ্নসহ তথ্য দিয়ে PIR পূরণ করলে লাগেজ শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
চেক-ইনের সময় বোর্ডিং পাস বা অন্য নথির সঙ্গে যে baggage tag/claim tag দেওয়া হয়, লাগেজ হাতে পাওয়ার আগে সেটি ফেলে দেওয়া উচিত নয়।
কারণ হারানো ব্যাগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ব্যাগেজ ট্যাগের নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নম্বর ব্যবহার করে এয়ারলাইন সংশ্লিষ্ট ব্যাগের যাত্রাপথ শনাক্ত করতে পারে।
তাই অভিযোগ করার সময় সঙ্গে রাখুন—
পাসপোর্ট
বোর্ডিং পাস
ব্যাগেজ ট্যাগ বা claim tag
ফ্লাইট নম্বর ও ভ্রমণের তথ্য
বাংলাদেশে সচল মোবাইল নম্বর
লাগেজ পৌঁছে দেওয়ার ঠিকানা
সম্ভব হলে ব্যাগের ছবি
PIR বা অভিযোগের কপিসহ দেওয়া reference number
বিশেষ করে PIR বা অন্য কোনো লিখিত অভিযোগ করলে তার ছবি বা কপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করুন।
সবচেয়ে ভালো হলো বিমানবন্দর ছাড়ার আগেই অভিযোগ করা। তবে বাইরে চলে আসার পর সমস্যাটি বুঝতে পারলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, Lost and Found বিভাগে যোগাযোগের নম্বর +880 1777715535। এছাড়া বিমানবন্দরের Call Center 13600 অথবা 09614-013600 নম্বরেও যোগাযোগ করা যায়। বিমানবন্দরের Call Center ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে।
তবে চেকড-ইন লাগেজের ক্ষেত্রে শুধু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে থেমে গেলে হবে না। যে এয়ারলাইনে যাত্রী ভ্রমণ করেছেন, সেই এয়ারলাইনের baggage service বা airport office-এর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে হবে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন এয়ারলাইনের baggage claim ও airport office-এর যোগাযোগের তথ্যও প্রকাশ করা আছে।
Lost and Found বা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন ব্যাগটি শনাক্ত করতে পারলে যাত্রীর পরিচয় যাচাই করে সেটি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, লাগেজ পাওয়া গেলে পরিচয় নিশ্চিত করার পর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন বা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যাত্রীর দেওয়া ঠিকানায় লাগেজ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে।
তাই অভিযোগ করার সময় ঠিকানা ও সচল ফোন নম্বর নির্ভুলভাবে দেওয়া জরুরি।
স্যুটকেস বেল্টে এসেছে, কিন্তু সেটি ভাঙা, কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত—এ ক্ষেত্রেও বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার আগে বিষয়টি রিপোর্ট করা উচিত।
শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, লাগেজ কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত পাওয়া গেলে Help Desk-এর সহায়তায় সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন বা Lost and Found বিভাগে লিখিত অভিযোগ করতে হবে।
সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগের বিভিন্ন দিক থেকে ছবি ও ভিডিও তুলে রাখুন। ব্যাগের কোনো জিনিস অনুপস্থিত থাকলে তার তালিকাও তৈরি করুন।
PIR করার পর পাওয়া reference number অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগের সময় এই নম্বর ব্যবহার করুন।
এয়ারলাইনভেদে delayed baggage tracking-এর ব্যবস্থা আলাদা হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের baggage service-এর নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময়েও ব্যাগ পাওয়া না গেলে এয়ারলাইনের কাছে আনুষ্ঠানিক claim করার প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষতিপূরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং দাবি করার সময়সীমা এয়ারলাইন ও প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের এয়ারলাইনের baggage policy দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শাহজালাল বিমানবন্দরের অফিসিয়াল FAQ অনুযায়ী, Lost and Found-এ অনুসন্ধানের পরও লাগেজ না পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় tracing-এর জন্য সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
গুরুতর ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের Heavy Baggage Gate No. 1-এর কাছে Airport Magistrate’s Office-এ লিখিত অভিযোগ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী Lost and Found/Baggage Claim সেবা ২৪ ঘণ্টা পাওয়া যায়।
লাগেজ হারানো বা দেরিতে পৌঁছানোর ঘটনা পুরোপুরি ঠেকানো যাত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কয়েকটি সাধারণ প্রস্তুতি পরবর্তী ঝামেলা অনেকটাই কমাতে পারে।
ভ্রমণের আগে স্যুটকেসের ছবি তুলে রাখা ভালো। ব্যাগের বাইরে নাম ও যোগাযোগের তথ্যসহ পরিচয় ট্যাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। পুরোনো এয়ারলাইনের baggage barcode বা sticker থাকলে তা সরিয়ে ফেলুন এবং নতুন ব্যাগেজ ট্যাগের ছবি মোবাইলে রেখে দিন।
পাসপোর্ট, অর্থ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মূল্যবান ইলেকট্রনিকস এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সম্ভব হলে এয়ারলাইনের নিয়ম মেনে cabin baggage-এ রাখা ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লাগেজ না পেলে বিমানবন্দর থেকে তাড়াহুড়া করে বের হয়ে যাবেন না। প্রথমেই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন ও Lost and Found বিভাগে রিপোর্ট করুন এবং অভিযোগের reference/PIR number সংগ্রহ করে রাখুন। পরবর্তী অনুসন্ধান ও দাবি প্রক্রিয়ায় এই নথিই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি হতে পারে।
সূত্র: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (HSIA), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
মন্তব্য করুন