aviation
প্রকাশিত: 16 October 2026, 7:15:17 Am
অনলাইন সংস্করণ

মাঝ আকাশে হঠাৎ কেঁপে ওঠে উড়োজাহাজ, কী এই টার্বুলেন্স এবং কেন ঘটে?

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

আকাশে স্বাভাবিকভাবে উড়ে চলেছে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। হঠাৎ শুরু হলো ঝাঁকুনি। কখনো সামান্য কেঁপে উঠছে, আবার কখনো মনে হচ্ছে উড়োজাহাজটি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিমান চলাচলের ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় ‘এয়ারক্রাফট টার্বুলেন্স’ (Aircraft Turbulence)।

টার্বুলেন্স মূলত বায়ুমণ্ডলে বাতাসের অনিয়মিত গতিবিধির কারণে উড়োজাহাজের স্বাভাবিক চলাচলে সৃষ্ট ঝাঁকুনি বা অস্থিরতা। এটি বিমান চলাচলের একটি পরিচিত ঘটনা। অধিকাংশ টার্বুলেন্স সাময়িক ও তুলনামূলকভাবে কম তীব্রতার হলেও শক্তিশালী টার্বুলেন্স যাত্রী ও কেবিন ক্রুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কেন হয় এয়ারক্রাফট টার্বুলেন্স?

বায়ুমণ্ডলের বাতাস সব জায়গায় একই গতিতে বা একই দিকে প্রবাহিত হয় না। কোথাও বাতাস দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হয়, কোথাও ধীরগতিতে। আবার কোনো এলাকায় বাতাস ওপরের দিকে উঠে যায়, অন্য এলাকায় নিচের দিকে নেমে আসে।

উড়োজাহাজ যখন এ ধরনের অনিয়মিত বায়ুপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেটি হঠাৎ ওপরে-নিচে বা ডানে-বাঁয়ে কেঁপে উঠতে পারে। মূলত বাতাসের গতি, দিক ও চাপের পরিবর্তনের কারণেই টার্বুলেন্স সৃষ্টি হয়।

বজ্রঝড়, মেঘের ভেতরে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ, পাহাড়ি অঞ্চলে বাতাসের বাধাপ্রাপ্ত হওয়া এবং উচ্চ আকাশে দ্রুতগতির জেট স্ট্রিমের আশপাশে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন টার্বুলেন্স সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

পরিষ্কার আকাশেও হতে পারে টার্বুলেন্স

অনেক যাত্রী মনে করেন, শুধু খারাপ আবহাওয়া বা কালো মেঘের মধ্যেই উড়োজাহাজ ঝাঁকুনির মুখে পড়ে। বাস্তবে পরিষ্কার আকাশেও টার্বুলেন্স হতে পারে।

এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স’ (Clear Air Turbulence বা CAT)। সাধারণত উচ্চ আকাশে বাতাসের গতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বা উইন্ড শিয়ারের কারণে এটি সৃষ্টি হয়।

ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্সের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে দৃশ্যমান মেঘ বা বজ্রঝড়ের উপস্থিতি থাকে না। ফলে প্রচলিত আবহাওয়া রাডারে এটি সরাসরি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।

এ কারণেই কখনো কখনো আবহাওয়া স্বাভাবিক মনে হলেও উড়োজাহাজ হঠাৎ ঝাঁকুনির মুখে পড়তে পারে।

টার্বুলেন্স কত ধরনের?

বিমান চলাচলে টার্বুলেন্সের তীব্রতা সাধারণত চারটি পর্যায়ে বিবেচনা করা হয়।

প্রথমটি হলো লাইট টার্বুলেন্স (Light Turbulence)। এতে উড়োজাহাজে হালকা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। সাধারণত যাত্রীদের জন্য এটি বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে না।

দ্বিতীয়টি মডারেট টার্বুলেন্স (Moderate Turbulence)। এ অবস্থায় ঝাঁকুনি তুলনামূলক বেশি হয় এবং কেবিনের ভেতরে চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তৃতীয়টি সিভিয়ার টার্বুলেন্স (Severe Turbulence)। এতে উড়োজাহাজের উচ্চতা ও অবস্থানে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। সিটবেল্ট না বাঁধা যাত্রী বা কেবিন ক্রু আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

চতুর্থটি এক্সট্রিম টার্বুলেন্স (Extreme Turbulence)। এটি অত্যন্ত বিরল ও তীব্র ধরনের পরিস্থিতি, যেখানে উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা সাময়িকভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

টার্বুলেন্সে কি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হতে পারে?

আধুনিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ বিভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহ ও টার্বুলেন্স সহ্য করার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নকশা ও পরীক্ষা করা হয়। ফলে সাধারণ টার্বুলেন্সের কারণে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম।

তবে শক্তিশালী টার্বুলেন্সে কেবিনের ভেতরে যাত্রী ও ক্রুদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে সিটবেল্ট না বাঁধা অবস্থায় হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হলে যাত্রী আসন থেকে ছিটকে যেতে পারেন।

এ ছাড়া খাবারের ট্রলি, লাগেজ বা কেবিনের অন্যান্য আলগা জিনিসপত্রও আঘাতের কারণ হতে পারে।

তাই টার্বুলেন্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোর একটি হলো সিটবেল্ট ব্যবহার।

পাইলটরা কীভাবে টার্বুলেন্স মোকাবিলা করেন?

ফ্লাইট পরিচালনার আগে পাইলটরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সম্ভাব্য ঝড়, জেট স্ট্রিম ও টার্বুলেন্স-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করেন।

উড্ডয়নের পর উড়োজাহাজের আবহাওয়া রাডার, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের তথ্য এবং অন্য পাইলটদের দেওয়া আবহাওয়া প্রতিবেদন ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।

প্রয়োজনে পাইলটরা উড়োজাহাজের উচ্চতা বা গতিপথ পরিবর্তনের অনুমতি চান। টার্বুলেন্সের তীব্রতা অনুযায়ী উপযুক্ত গতি বজায় রাখা এবং কেবিন ক্রুদের নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সব ধরনের টার্বুলেন্স আগাম শনাক্ত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান পূর্বসংকেত ছাড়াই দেখা দিতে পারে।

যাত্রীদের কী করা উচিত?

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যাত্রীরা আসনে বসে থাকা অবস্থায় সব সময় সিটবেল্ট বাঁধা রাখলে আকস্মিক টার্বুলেন্সে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

সিটবেল্ট সংকেত চালু হলে আসন ছেড়ে ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে কেবিন ক্রুদের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে এবং শিশুদের নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

টার্বুলেন্সের সময় আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা জরুরি। কারণ উড়োজাহাজে ঝাঁকুনি অনুভূত হওয়া মানেই সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, এমন নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে কি টার্বুলেন্স বাড়ছে?

সাম্প্রতিক বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু অঞ্চলে ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার পার্থক্য ও উচ্চ আকাশের বায়ুপ্রবাহে পরিবর্তন ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু আকাশপথে টার্বুলেন্সের মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়াতে পারে বলে গবেষকরা আশঙ্কা করছেন।

তবে সব ধরনের টার্বুলেন্স বা বিশ্বের সব অঞ্চলে একই হারে এর বৃদ্ধি ঘটছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান এবং আধুনিক ফ্লাইট পরিকল্পনার মাধ্যমে টার্বুলেন্সজনিত ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে এয়ারক্রাফট টার্বুলেন্স বিমান চলাচলের একটি স্বাভাবিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি উড়োজাহাজের জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি না করলেও যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য সিটবেল্ট ব্যবহার এবং পাইলট ও কেবিন ক্রুদের নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA), ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (NWS) এবং টার্বুলেন্সবিষয়ক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিমানবন্দরে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম স্থাপন করা হবে: প্রতিমন্ত

1

বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সে চাকরির নামে প্রতারণা থেকে সতর্ক থাক

2

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনায় বিধিনিষেধ, ১০০ ফ্লাই

3

৮০ লাখ সক্ষমতায় ১ কোটি ২৬ লাখ যাত্রী, শাহজালালের চাপ কমাতে ১

4

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষ ফ্লাইটে আরও ২৩ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত

5

তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিবহনের

6

আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ, ব্যয় হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার

7

বিমানবন্দরের ফ্রি শাটল সার্ভিসে বাড়ছে যাত্রীদের সাড়া, স্বাচ্

8

প্রথমবার আকাশে উড়ল Airbus A350F, শুরু হলো নয় মাসের ফ্লাইট পর

9

বাংলাদেশ–সৌদি রুটে ফ্লাইট ৪৯ থেকে বেড়ে ৮৫, কমবে টিকিট সংকট

10

সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ বেশি যাত্রী সামলাচ্ছে শাহজালাল

11

২৯ জুলাই থেকে প্রতিদিন ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইট চালু করছে এয়ার ইন্

12

জুলাইয়ে ৫৩ উড়োজাহাজ সরবরাহ বোয়িংয়ের, সাত মাসে বেড়েছে ১২ শতাং

13

বেবিচকে ১৪তম থেকে ২০তম গ্রেডের অপেক্ষমাণ তালিকার ফল প্রকাশ,

14

শাহজালালে সোনা চোরাচালান থামছেই না: পাঁচ বছরে জব্দ প্রায় ২ হ

15

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্

16

সৌদি আরবে ফের ফ্লাইট বাড়াচ্ছে বিমান, দাম্মাম ও জেদ্দায় নতুন

17

এক যাত্রীর সঙ্গে ৫-১০ স্বজন: বাংলাদেশি সংস্কৃতির চাপ সামলাতে

18

শাহজালাল বিমানবন্দরে ৫ কেজির বেশি কুশসহ দুই ভারতীয় নাগরিক গ্

19

শাহজালালে কোন কাজ বেবিচকের, কোনটি বিমানের—জানুন দায়িত্বের সী

20