বাংলাদেশের বিমান চলাচলের ইতিহাসে ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের একটি ঘটনা আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। জাপান এয়ারলাইন্সের (JAL) একটি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে ঢাকার তৎকালীন প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তেজগাঁওয়ে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে চলতে থাকে জিম্মি সংকট, আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা।
ছিনতাই হওয়া উড়োজাহাজটি ছিল Japan Airlines Flight 472, একটি Douglas DC-8। প্যারিস থেকে টোকিওগামী ফ্লাইটটি বিভিন্ন যাত্রাবিরতির মাধ্যমে গন্তব্যে যাচ্ছিল। ভারতের বোম্বে—বর্তমান মুম্বাই—থেকে উড্ডয়নের পরপরই জাপানের উগ্র বামপন্থী সংগঠন Japanese Red Army (JRA)-এর সদস্যরা উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এরপর বিমানটিকে ঢাকার তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়। ঘটনাটি দ্রুত বাংলাদেশ, জাপানসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান খবরে পরিণত হয়।
বিমানটিতে যাত্রী ও ক্রুসহ শতাধিক মানুষ ছিলেন। ছিনতাইকারীরা জাপানের কারাগারে থাকা তাদের কয়েকজন সহযোগীর মুক্তি এবং ৬০ লাখ মার্কিন ডলার দাবি করে।
ফলে ঘটনাটি শুধু একটি বিমান ছিনতাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি দ্রুত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
ঢাকায় বিমানটি অবস্থান করার সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চালানো হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সংকটের সমাধান করাই ছিল তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে জিম্মিদের একটি অংশকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জিম্মিদের জীবন রক্ষার বিষয়টি সামনে রেখে জাপান সরকার শেষ পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের প্রধান কয়েকটি দাবি মেনে নেয়। মুক্তিপণের অর্থ এবং মুক্তি পাওয়া কয়েকজন বন্দিকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
এরপর অবশিষ্ট জিম্মিদের সঙ্গে নিয়ে ছিনতাইকারীরা ঢাকা ত্যাগ করে।
বিমানটি পরবর্তী সময়ে কয়েকটি স্থানে যাত্রাবিরতির পর আলজেরিয়ায় পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট জিম্মিরাও মুক্তি পান এবং সংকটের অবসান ঘটে।
ঘটনাটি সে সময় আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে বেসামরিক উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
JAL Flight 472-এর ঘটনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে একই সময় দেশে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা।
ঢাকায় বিমান ছিনতাই সংকট চলাকালে ১৯৭৭ সালের ১ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক জিম্মি সংকট, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ সামরিক অস্থিরতা—দুটি গুরুতর পরিস্থিতি প্রায় একই সময়ে মোকাবিলা করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে।
দুটি ঘটনা আলাদা হলেও সময়ের এই যোগসূত্রের কারণে ১৯৭৭ সালের তেজগাঁও বিমানবন্দর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিমান চলাচলের ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
বর্তমান সময়ের বিমানবন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকের পরিস্থিতির বড় পার্থক্য ছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমান ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা ঘটার পর ধীরে ধীরে যাত্রী ও ব্যাগেজ স্ক্রিনিং, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা এবং বিমানবন্দর নিরাপত্তা জোরদার হতে থাকে।
আজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীরা যে security screening, restricted area access, baggage inspection এবং বিভিন্ন স্তরের aviation security ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যান, সেগুলো কয়েক দশক ধরে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ।
তবে JAL Flight 472-এর ঘটনার পরই বাংলাদেশের বর্তমান বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থা সরাসরি চালু হয়েছিল—এমন সরল কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে বিভিন্ন ঘটনা, নতুন হুমকি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কিন্তু বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের পুরোনো ইতিহাসের বড় একটি অংশ জড়িয়ে রয়েছে তেজগাঁও বিমানবন্দরের সঙ্গে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত তেজগাঁও বিমানবন্দর পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পরও নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকার প্রধান বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল এটি।
ফলে আজকের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে ওঠার আগের যুগে বিদেশ থেকে ঢাকায় আসা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোর পরিচিত গন্তব্য ছিল তেজগাঁও।
প্রায় পাঁচ দশক পর ঘটনাটি ফিরে দেখলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে।
প্রথমত, একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন বা যাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যে দেশে বিমানটি অবতরণ করে, সেই দেশের বিমানবন্দর, নিরাপত্তা সংস্থা, সরকার ও কূটনৈতিক ব্যবস্থাও তাৎক্ষণিকভাবে সংকটের অংশ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, জিম্মি পরিস্থিতিতে aviation security-এর পাশাপাশি crisis management, international coordination এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ঘটনাটি বাংলাদেশের পুরোনো বিমান চলাচলের অবকাঠামো ও তেজগাঁও বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক ভূমিকার একটি বিরল ঐতিহাসিক স্মারক।
বাংলাদেশের বিমান চলাচলের ইতিহাস শুধু নতুন বিমানবন্দর, নতুন এয়ারলাইন বা নতুন রুট চালুর ইতিহাস নয়। দুর্ঘটনা, সংকট, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার বিবর্তনও এর অংশ।
JAL Flight 472-এর ঢাকায় অবতরণ সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঘটনাটি দেখিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে একটি সংকট মুহূর্তের মধ্যেই কীভাবে একাধিক দেশকে যুক্ত করে বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তেজগাঁও বিমানবন্দরের সেই জিম্মি সংকট আজ অতীত। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক পরও ঘটনাটি বাংলাদেশের এভিয়েশন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আন্তর্জাতিক ঘটনার স্মৃতি বহন করছে।
সূত্র: ঐতিহাসিক বিমান চলাচল নথি, JAL Flight 472-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য ও সমসাময়িক ঘটনার বিবরণ
মন্তব্য করুন