এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিরীক্ষায়। যাত্রী, লাগেজ, কার্গো ও বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এভিয়েশন সিকিউরিটি বা এভসেক (AVSEC) বিভাগের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিরাপত্তা তল্লাশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমে যুক্ত থাকলেও এ বিভাগের অবদান অনেক সময় জনসমক্ষে সেভাবে উঠে আসে না।
বিমানবন্দরে অবৈধ ও নিষিদ্ধ পণ্য শনাক্তকরণ, সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে এভসেকের ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব কার্যক্রমে কাস্টমস, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানেরও নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। ফলে সফল অভিযানের পেছনে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বও কম নয়।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি এসেছে যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের (DfT) সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অডিটে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত মূল্যায়নের ফল অনুযায়ী, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৪ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছে। ২০২৫ সালের একই মূল্যায়নে বিমানবন্দরটির স্কোর ছিল ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিরাপত্তা মূল্যায়নে আরও উন্নতি হয়েছে।
একই অডিটে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত কার্গো নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল্যায়নে শতভাগ কমপ্লায়েন্স অর্জনের তথ্য জানিয়েছে বেবিচক।
যুক্তরাজ্যগামী যাত্রী ও কার্গোর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত এই অডিটে যাত্রী, কার্গো ও ডাক পরিবহনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
এই ফলাফল বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় চলমান উন্নয়নের একটি পরিমাপযোগ্য প্রমাণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রচেষ্টার গুরুত্বও তুলে ধরে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ, মাদক, নিষিদ্ধ সামগ্রী কিংবা ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য উদ্ধারের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনায় অনেক সময় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। কোনো অবৈধ পণ্য বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও তল্লাশি ব্যবস্থায় শনাক্ত হওয়ার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কাজ করেছে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট এলাকায় প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এ ধরনের ঘটনা দেখায়, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থার নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—উদ্ধারের সংখ্যা বাড়লেই নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রকৃত কার্যকারিতা মূল্যায়নে শনাক্ত হওয়া ঘটনার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা, গোয়েন্দা তথ্য, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত অডিটের ফলাফলও বিবেচনা করতে হয়।
বিমানবন্দরে কোনো অবৈধ পণ্য উদ্ধারের ঘটনা ঘটলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা পণ্য জব্দকারী প্রতিষ্ঠানের নামই বেশি আলোচনায় আসে। কিন্তু বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় এভসেকের দায়িত্ব রয়েছে প্রতিদিনের কার্যক্রমজুড়ে।
যাত্রী ও হ্যান্ডব্যাগেজ তল্লাশি, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশের বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন, বিমানবন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনার সুরক্ষা এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয়—এসব কাজে এভসেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে বিষয়টি হস্তান্তর বা সমন্বিত কার্যক্রমের প্রয়োজনও হতে পারে।
এ কারণে সফল অভিযানের সংবাদে শুধু চূড়ান্তভাবে পণ্য জব্দকারী সংস্থার নাম নয়, সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবদানও যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তবে নির্দিষ্ট অভিযানে এভসেকের প্রত্যক্ষ ভূমিকা উল্লেখের ক্ষেত্রে সেই অভিযানের আনুষ্ঠানিক তথ্য যাচাই করা জরুরি।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জটিল ও সমন্বিত কার্যক্রম। এখানে এভসেকের পাশাপাশি এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ, কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা, ইমিগ্রেশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও বিমানবন্দরের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এভসেকের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিমানবন্দরের দৈনন্দিন নিরাপত্তা কার্যক্রম সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণের সঙ্গে এ বিভাগের কাজ সরাসরি সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক অডিটে ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করলেও বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া।
বিমান চলাচলের পরিমাণ বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবর্তিত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তদারকি ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ এবং ভবিষ্যৎ অডিটের প্রস্তুতি বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আইকাওর ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম–কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ (USAP-CMA) অডিট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে বেবিচকের সদর দপ্তরসহ শাহজালাল ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হবে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কার্যক্রমের বড় একটি অংশ যাত্রীদের চোখের আড়ালে পরিচালিত হয়। যাত্রীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে যেমন দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তেমনি সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রতিরোধে প্রয়োজন সতর্ক নিরাপত্তাকর্মী।
আন্তর্জাতিক অডিটে শাহজালালের স্কোর বৃদ্ধি এবং কার্গো নিরাপত্তায় ইতিবাচক মূল্যায়ন বেবিচকের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। এই অর্জনের পেছনে এভসেকসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দরে অবৈধ পণ্য শনাক্ত হওয়ার ঘটনাকে কেবল নিরাপত্তার দুর্বলতা হিসেবে না দেখে কোথায় এবং কীভাবে তা শনাক্ত হয়েছে, কোন সংস্থা কী ভূমিকা রেখেছে এবং পরবর্তী ব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছে—সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন পরিমাপযোগ্য। সেই অগ্রগতি ধরে রাখতে এভসেকের পেশাদারত্ব, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন