এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নতুন গতি পেয়েছে। ঢাকা–সিউল রুটে নিয়মিত যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকার।
প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮টি যাত্রীবাহী এবং ২৮টি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ রাখা হতে পারে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত কাঠামোয় সপ্তাহে মোট সর্বোচ্চ ৫৬টি ফ্লাইটের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
তবে এটি এখনো প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সপ্তাহে ৫৬টি ফ্লাইট চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কোনো এয়ারলাইন্সের নির্দিষ্ট ফ্লাইট সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ঢাকা–সিউল সরাসরি ফ্লাইট চালু, দুই দেশের বিমান চলাচল সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে কোরিয়ান দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি ক্যাং সুং ইয়ং এবং বাংলাদেশের পক্ষে বেবিচকের এয়ার ট্রান্সপোর্টেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ সফিউল আজম উপস্থিত ছিলেন।
বেবিচক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, পর্যটন ও জনশক্তি খাতে সম্পর্ক বাড়ছে। এসব খাতে যোগাযোগ আরও সহজ করতে সরাসরি আকাশপথ চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কোনো নিয়মিত সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইট নেই। ফলে বাংলাদেশ থেকে সিউল কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যান্য গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের তৃতীয় কোনো দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়।
এতে ভ্রমণের সময় বাড়ার পাশাপাশি ট্রানজিট, ব্যাগেজ এবং সংযোগকারী ফ্লাইটের বাড়তি ঝামেলাও তৈরি হতে পারে।
সরাসরি ঢাকা–সিউল ফ্লাইট চালু হলে প্রবাসী কর্মী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের জন্য দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্যও বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা যান।
সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে বিশেষ করে এসব যাত্রী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ ট্রানজিটের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ার ক্ষেত্রেও উন্নত বিমান যোগাযোগ সহায়ক হতে পারে।
ঢাকা–সিউল সরাসরি রুট শুধু দক্ষিণ কোরিয়াগামী যাত্রীদের জন্য নয়, উত্তর আমেরিকাগামী যাত্রীদের জন্যও নতুন সংযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিউলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন শহরে সংযোগ পাওয়া সম্ভব হলে বাংলাদেশের যাত্রীদের সামনে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক প্রচলিত ট্রানজিট রুটের পাশাপাশি আরেকটি বিকল্প তৈরি হবে।
তবে এই সুবিধা নির্ভর করবে কোন এয়ারলাইন রুটটি পরিচালনা করবে, তাদের পরবর্তী গন্তব্যের নেটওয়ার্ক, কোডশেয়ার বা ইন্টারলাইন সুবিধা, টিকিটের মূল্য এবং ফ্লাইট সূচির ওপর।
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সরাসরি কার্গো যোগাযোগ।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮টি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ রাখার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং দ্রুত পরিবহন প্রয়োজন—এমন উচ্চমূল্যের পণ্য সরাসরি দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে পাঠানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিপণ্য পরিবহনেও সরাসরি কার্গো সংযোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ ফ্লাইট অধিকার এবং বাস্তবে পরিচালিত ফ্লাইটের সংখ্যা এক বিষয় নয়। প্রকৃত কার্গো ফ্লাইটের সংখ্যা বাজারের চাহিদা ও এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারদের একটি। তৈরি পোশাক, প্রযুক্তি, শিল্প ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে।
সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ব্যবসায়িক সফরে ভ্রমণ সময় কমে এলে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে নতুন বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বেবিচকের এয়ার ট্রান্সপোর্টেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ সফিউল আজম জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে আগে নন-সিডিউল ফ্লাইট পরিচালিত হতো। বিভিন্ন অভিযোগের কারণে এসব ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে। এখন নিয়মিত ফ্লাইটকে একটি আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিমান চলাচল সহযোগিতার ভিত্তি নতুন নয়।
১৯৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে Air Services Agreement (ASA) এবং Confidential Memorandum of Understanding (CMU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
সেই কাঠামো অনুযায়ী, উভয় দেশ একটি করে এয়ারলাইনকে নির্ধারিত এয়ারলাইন হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে কোনো নির্ধারিত এয়ারলাইন মনোনয়ন না দেওয়ায় ঢাকা–সিউল রুটে নিয়মিত শিডিউল ফ্লাইট চালু হয়নি।
দুই দেশের মধ্যে ফ্লাইট অধিকার সম্প্রসারণের আলোচনা সফল হলেও এরপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে কোন এয়ারলাইন ঢাকা–সিউল রুট পরিচালনা করবে এবং রুটটি বাণিজ্যিকভাবে কতটা টেকসই হবে।
এয়ার সার্ভিস চুক্তিতে ফ্লাইট পরিচালনার অধিকার থাকা এবং বাস্তবে কোনো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু করা দুটি আলাদা ধাপ।
এয়ারলাইন্সকে যাত্রীচাহিদা, কার্গো বাজার, উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা, স্লট, পরিচালন ব্যয় এবং সম্ভাব্য রাজস্ব বিবেচনা করেই রুট চালুর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান আলোচনা চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নিলে এবং কোনো এয়ারলাইন নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায় এগিয়ে এলে ঢাকা–সিউল সরাসরি আকাশ যোগাযোগে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ ও কার্গো যোগাযোগেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), দক্ষিণ কোরিয়া দূতাবাসের সঙ্গে বৈঠকসংশ্লিষ্ট তথ্য
মন্তব্য করুন