এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
ইরানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে প্রতিবেশী দেশগুলো সহযোগিতা করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসিন রেজায়ী বলেছেন, ইরানি উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্ত হলে তাদের বিমানবন্দরও স্বাভাবিকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজায়ী প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান। তবে কোনো দেশ ইরানি ফ্লাইটে বিধিনিষেধ আরোপ করলে তেহরান ঠিক কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি। ফলে তার বক্তব্যে সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা অন্য কোনো পদক্ষেপের বিষয়টি নির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার হয়নি।
ইরানের বিমান চলাচল খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর পর তেহরানের এই হুঁশিয়ারি এলো। গত ৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের Office of Foreign Assets Control (OFAC) ‘Operation Economic Outcast’-এর আওতায় ইরানের বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। এর মধ্যে ২৭টি ইরানি এয়ারলাইনও রয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট পরবর্তী সময়ে সতর্ক করেন, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি এয়ারলাইনগুলোকে বিদেশি বিমানবন্দরে অবতরণ, জ্বালানি সরবরাহ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কিংবা অন্যান্য সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তাদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য শুধু অন্য দেশে অবতরণের অনুমতি থাকাই যথেষ্ট নয়। উড়োজাহাজের জ্বালানি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ব্যাগেজ সেবা, প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা এবং বিভিন্ন বিমানবন্দর সেবার প্রয়োজন হয়। এসব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির কারণে সহযোগিতা সীমিত করলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের পক্ষে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নতুন চাপের প্রভাব ইতোমধ্যে ইরানের কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটে দেখা যাচ্ছে। ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাগদাদ ও মাস্কাটে ইরানি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। আজারবাইজান ও জর্জিয়াতেও ইরানি ফ্লাইটের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও চীনের কয়েকটি গন্তব্যে কিছু ফ্লাইট চালু থাকলেও বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
তবে কোনো দেশে ইরানি এয়ারলাইনের ফ্লাইট বন্ধ হওয়া এবং সেই দেশের আকাশসীমা পুরোপুরি ইরানি উড়োজাহাজের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। বিমানবন্দরে অবতরণের অনুমতি, গ্রাউন্ড সার্ভিস এবং অন্য দেশের আকাশসীমা ব্যবহার বা overflight permission পৃথক নিয়ন্ত্রক বিষয়ের আওতায় পড়তে পারে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরো অঞ্চলের আকাশসীমা ইরানি উড়োজাহাজের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে—এভাবে দেখা ঠিক হবে না।
পরিস্থিতির কারণে ইরানি এয়ারলাইনে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী যাত্রীদের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনো বিমানবন্দর বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান শেষ মুহূর্তে সেবা সীমিত করলে ফ্লাইট বাতিল, সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা বিকল্প গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে connecting flight থাকা যাত্রীদের ক্ষেত্রে একটি ফ্লাইটের পরিবর্তন পুরো যাত্রাপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলের বিমান চলাচলে নতুন ধরনের operational uncertainty তৈরি হয়েছে। ইরানি এয়ারলাইনকে সেবা দেওয়া বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে একদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য ঝুঁকি, অন্যদিকে তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো পাল্টা ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। তাই রেজায়ীর বক্তব্যকে এই পর্যায়ে একটি হুঁশিয়ারি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে আরও কতটি দেশ বা বিমানবন্দর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানি এয়ারলাইনগুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং তেহরান তার প্রতিক্রিয়ায় কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
তথ্যসূত্র: Iran Civil Aviation Organization।
মন্তব্য করুন