aviation
প্রকাশিত: 3 October 2026, 10:48:38 Am
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের প্রথম নারী বাণিজ্যিক পাইলট কানিজ ফাতেমা রোকসানার আত্মত্যাগের ৪২ বছর

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে পথিকৃৎ এক নাম কানিজ ফাতেমা রোকসানা। দেশের প্রথম নারী বাণিজ্যিক পাইলট হিসেবে এমন এক সময়ে তিনি আকাশে ওড়ার পেশায় প্রবেশ করেছিলেন, যখন বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের cockpit ছিল প্রায় পুরোপুরি পুরুষদের কর্মক্ষেত্র।

নিজের যোগ্যতা প্রমাণের পাশাপাশি পাইলট নিয়োগে নারী হিসেবে বাধার মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি। শেষ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দিয়ে দেশের নারীদের জন্য বাণিজ্যিক বৈমানিক হওয়ার একটি নতুন পথ তৈরি করেন।

কিন্তু তাঁর সম্ভাবনাময় কর্মজীবন থেমে যায় মাত্র ২৯ বছর বয়সে। ১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের BG426 ফ্লাইট দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। ওই দুর্ঘটনায় উড়োজাহাজে থাকা ৪৯ জনের কেউই বেঁচে ছিলেন না।

স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার

কানিজ ফাতেমা রোকসানা ১৯৫৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘তিতলি’। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই আকাশে ওড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বলে তাঁর জীবন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের একজন নারীর professional pilot হওয়ার স্বপ্ন ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী।

রোকসানা ১৯৭৬ সালে Bangladesh Flying Club-এ প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে commercial pilot licence অর্জন করেন। এরপর তিনি flying instructor হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু licence পাওয়া আর একটি commercial airline-এর cockpit-এ জায়গা করে নেওয়া তাঁর জন্য একই রকম সহজ ছিল না।

বিমানে যোগ দিতেও লড়তে হয়েছিল

১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের pilot recruitment পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন রোকসানা। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তাঁর নিয়োগ বিলম্বিত হয়েছিল বলে তাঁর জীবন নিয়ে প্রকাশিত একাধিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু পুরুষ প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর সামনে নতুন বাধা তৈরি করে।

রোকসানা সেই বৈষম্য মেনে নেননি। শেষ পর্যন্ত ২৬ ডিসেম্বর ১৯৭৯ তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রথম নারী cadet pilot হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে First Officer হন।

বাংলাদেশের aviation history-তে তাঁর এই অর্জনের গুরুত্ব এখানেই—তিনি শুধু নিজে cockpit-এ পৌঁছাননি, একজন নারীও যে পেশাদার commercial pilot হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই পথটি দৃশ্যমান করে দিয়েছিলেন।

৫ আগস্ট ১৯৮৪: বাংলাদেশের এভিয়েশনের এক শোকাবহ দিন

১৯৮৪ সালের ৫ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের Flight BG426 চট্টগ্রামের তৎকালীন পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে ঢাকার তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল।

ফ্লাইটটি পরিচালিত হচ্ছিল একটি Fokker F27-600 উড়োজাহাজ দিয়ে, যার registration ছিল S2-ABJ। উড়োজাহাজে ছিলেন ৪৫ যাত্রী ও চারজন crew member।

ফ্লাইটটির Captain ছিলেন কায়েস আহমেদ মজুমদার। First Officer হিসেবে cockpit-এ ছিলেন কানিজ ফাতেমা রোকসানা।

সেদিন ঢাকার আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। ভারী বৃষ্টিতে দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।

প্রকাশিত দুর্ঘটনা বিবরণ অনুযায়ী, crew প্রথমে Runway 32-এ VOR approach-এর চেষ্টা করেন। runway দেখতে না পাওয়ায় missed approach করা হয়। এরপর Runway 14-এ ILS approach-এর চেষ্টা করেও runway শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং দ্বিতীয়বার missed approach করতে হয়।

পরবর্তী approach-এর সময় উড়োজাহাজটি runway-তে পৌঁছানোর আগেই অত্যন্ত নিচে নেমে আসে এবং বিমানবন্দরের কাছে একটি জলাভূমিতে বিধ্বস্ত হয়।

প্রাণ হারান ৪৯ জন

দুর্ঘটনায় উড়োজাহাজে থাকা ৪৫ যাত্রী ও চার crew member—মোট ৪৯ জনই নিহত হন। কেউ বেঁচে ছিলেন না।

আজও এটি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত।

তবে দুর্ঘটনার কারণ বর্ণনার ক্ষেত্রে শুধু ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল’ বলা পুরো ঘটনাটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

উপলব্ধ দুর্ঘটনা বিবরণে ঘটনাটিকে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে controlled flight into terrain (CFIT) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

CFIT বলতে সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি airworthy aircraft অনিচ্ছাকৃতভাবে ভূমি, পাহাড়, পানি বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।

দুর্ঘটনা নয়, রোকসানার পরিচয়ের বড় অংশ তাঁর পথ তৈরি করা

কানিজ ফাতেমা রোকসানার নাম বাংলাদেশের aviation history-তে শুধু BG426 দুর্ঘটনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি এমন একটি পেশায় নারীদের প্রবেশের বাধা ভেঙেছিলেন, যেখানে সে সময় নারীর উপস্থিতি ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

Commercial pilot হতে শুধু উড়োজাহাজ চালাতে শেখাই যথেষ্ট নয়। নির্ধারিত flying hours, technical knowledge, medical fitness, navigation, meteorology, aircraft systems এবং operational procedure-সহ কঠোর প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন পাইলটকে এগোতে হয়।

রোকসানা সেই পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সের cockpit-এ জায়গা করে নিয়েছিলেন।

তাঁর পর আকাশে এসেছেন আরও বাংলাদেশি নারী

রোকসানার পথ ধরে পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশের আরও নারী commercial aviation-এ pilot হিসেবে যোগ দিয়েছেন। নারী পাইলটের সংখ্যা এখনও তুলনামূলক কম হলেও cockpit আর শুধুই পুরুষদের কর্মক্ষেত্র নয়।

এখানেই রোকসানার pioneering role বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কোনো পেশায় প্রথম হওয়ার অর্থ শুধু ব্যক্তিগত একটি রেকর্ড তৈরি করা নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তিটিকেই সামাজিক ধারণা, প্রাতিষ্ঠানিক বাধা এবং প্রচলিত পেশাগত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠিন পথটি অতিক্রম করতে হয়।

রোকসানার ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল।

বাংলাদেশের এভিয়েশন ইতিহাসের দুই বিপরীত অধ্যায়

কানিজ ফাতেমা রোকসানার জীবন বাংলাদেশের aviation history-র দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত অধ্যায়কে একসঙ্গে ধারণ করে।

একদিকে তাঁর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের cockpit-এ প্রবেশ ছিল দেশের নারীদের পেশাগত অগ্রগতির একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

অন্যদিকে BG426 দুর্ঘটনা বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি।

১৯৮৪ সালের সেই দুর্ঘটনায় তাঁর জীবন থেমে গেলেও তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, সেটি থেমে থাকেনি।

আজ বাংলাদেশি নারীরা commercial aircraft পরিচালনা করছেন, aviation training নিচ্ছেন এবং দেশ-বিদেশের aviation sector-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় কাজ করছেন।

তাদের সেই দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস লিখতে গেলে তাই ফিরে আসতেই হয় একটি নামের কাছে—কানিজ ফাতেমা রোকসানা।

তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী বাণিজ্যিক পাইলট; একই সঙ্গে দেশের নারীদের আকাশজয়ের ইতিহাসের এক অগ্রদূত।

সূত্র: প্রকাশিত ঐতিহাসিক নথি, বিমান দুর্ঘটনার রেকর্ড ও কানিজ ফাতেমা রোকসানার জীবনীসংক্রান্ত প্রতিবেদন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি প্রতি

1

শাহ আমানত বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ২০৭০ সালের মাস্টারপ্ল্যান,

2

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হতে পারে বেবিচকের নিয়োগ পরীক্ষ

3

১৪ বছর পর জার্মানি-সিরিয়ার মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট চাল

4

কার্গো সংকট কাটাতে শাহজালালে এআই ব্যবহারের উদ্যোগ, হচ্ছে নতু

5

বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ট্যাক্সিচালক নেবে দুবাই, ঢাকায় সরাসরি

6

দাম্মাম-রিয়াদগামী বিমান বাংলাদেশের সব ফ্লাইট স্থগিত

7

শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীসেবায় নতুন উদ্যোগ, ট্রলি ব্যবস্থা

8

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা–রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করল বিম

9

বেবিচকে বেসামরিক বিমান চলাচলের হুমকি ও ঝুঁকি মোকাবিলায় CATRA

10

অনুমোদনহীন ড্রোনে বিমান চলাচলে ঝুঁকি, বিশ্বের বহু বিমানবন্দর

11

২৯ জুলাই থেকে প্রতিদিন ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইট চালু করছে এয়ার ইন্

12

মাঝআকাশে যাত্রী গুরুতর অসুস্থ, লন্ডনগামী এমিরেটসের ফ্লাইটের

13

জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে চীনের তিন বৃহৎ এয়ারলাইন্স, বছর

14

১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে থার্ড টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য, লালমনিরহাট

15

রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধে ৮ ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত, ভোগান্তির মুখে

16

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ লাখ

17

বিধিমালা মেনেই পাইলট নিয়োগ ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন, যাত

18

আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হচ্ছে চট্টগ্রাম, ১৮ মাসের ফাস্ট-ট্র্যাক

19

বেবিচকের প্রযুক্তি সহকারী (গ্রেড-১০) পদের আবেদন আপাতত স্থগিত

20