এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি অস্থায়ী ও স্থায়ী ওয়্যারহাউজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিমানবন্দরের বাইরেও কার্গো ওয়্যারহাউজ স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন আমদানি কার্গো আসছে। তবে ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার বর্গফুট আয়তনের স্থায়ী আমদানি কার্গো টার্মিনাল ধ্বংস হওয়ার পর থেকে অস্থায়ী ব্যবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
অগ্নিকাণ্ডের আগে আমদানি কার্গো সংরক্ষণের জন্য প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার বর্গফুট জায়গা থাকলেও বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য স্থান কমে প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুটে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় কার্গো ব্যবস্থাপনার জায়গা প্রায় ৮১ শতাংশ কমেছে।
ফলে বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য সংরক্ষণ, বাছাই ও দ্রুত সরবরাহের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
কার্গো সংকটের দ্রুত সমাধানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় একটি অস্থায়ী ওয়্যারহাউজ নির্মাণের জন্য সাতটি সম্ভাব্য স্থান এবং একটি স্থায়ী ওয়্যারহাউজ নির্মাণের জন্য চারটি সম্ভাব্য স্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ওয়্যারহাউজ নির্মিত হলে আমদানি পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়বে এবং কার্গো খালাসের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিমানবন্দরের বাইরে ওয়্যারহাউজ স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে বিমানবন্দরের সীমিত জায়গার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কার্গো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দীর্ঘদিনের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান এখন সরকারের অগ্রাধিকার।
তিনি কার্গো ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুধু অনুসরণকারী নয়, বরং নেতৃত্বের অবস্থানে যেতে চায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমদানি করা পণ্যের আগমনসংক্রান্ত নোটিশ দ্রুত আমদানিকারকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুদামের ভেতরে নির্দিষ্ট পণ্যের অবস্থান শনাক্ত করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ প্রযুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গুদামে পণ্য খুঁজে বের করার সময় কমবে এবং আমদানিকারকদের কাছে দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কার্যক্রমে একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উড়োজাহাজ থেকে পণ্য নামানোর পর অফলোডিং, কার্গো ব্রেকডাউন, বাছাই ও ডেলিভারি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া ফর্কলিফটসহ বিভিন্ন গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট পরিচালনা এবং কার্গোবাহী যানবাহন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার সংকট রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় পণ্য খোলা বা অপর্যাপ্ত সুরক্ষিত স্থানে রাখতে হচ্ছে। এতে চুরি, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য নিরাপত্তাঝুঁকির পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে পানি ও আর্দ্রতার কারণে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ওষুধসহ তাপমাত্রা সংবেদনশীল পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
পাশাপাশি এসব পণ্যের নিরাপদ ও দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নির্দেশিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা তৈরি হলে ওষুধ ও অন্যান্য তাপমাত্রা সংবেদনশীল পণ্যের মান বজায় রেখে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদ্যমান অবকাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আধুনিক ও কার্যকর কার্গো ব্যবস্থাপনা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উন্নত কার্গো অবকাঠামো ও দ্রুত পণ্য পরিবহনব্যবস্থা প্রয়োজন।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত ওয়্যারহাউজ নির্মাণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সংকট অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
সূত্র: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার তথ্য।
মন্তব্য করুন