ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে ১৯ থেকে ২১ জুন শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা-বাগান মাঠে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে অংশ নেয় ২৭টি নৃ-গোষ্ঠী।
তিন দিনের আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প, পোশাক, জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে দেশের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়। উৎসবটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি কালচারাল ও কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের প্রসার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও গুরুত্ব পেয়েছে।
হারমোনি ফেস্টিভ্যালে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকার খাসিয়া, গারো, মণিপুরি, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, মুন্ডাসহ মোট ২৭টি নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তিন দিনে নাচ, গান ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প ও পোশাক প্রদর্শন করা হয়।
এ ধরনের আয়োজন পর্যটকদের শুধু একটি গন্তব্য ঘুরে দেখার পরিবর্তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ তৈরি করে।
ফলে শ্রীমঙ্গলের পরিচিত চা-বাগান ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের পাশাপাশি কালচারাল ট্যুরিজম নতুন পর্যটন পণ্য হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ফুলছড়া চা-বাগান মাঠে উৎসবের উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পর্যটনমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এথনিক ট্যুরিজমের প্রসারের মাধ্যমে দেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি হারমোনি ফেস্টিভ্যাল ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ এবং বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সিলেট অঞ্চলের বিমান যোগাযোগ ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে উঠে আসে।
কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পর্যটন থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধার একটি অংশ সরাসরি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা।
স্থানীয়ভাবে তৈরি হস্তশিল্প, পোশাক ও খাবার বিক্রি, স্থানীয় গাইডিং, আবাসন, পরিবহন এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন পণ্য তৈরি করা গেলে পর্যটন থেকে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
হারমোনি ফেস্টিভ্যালের মতো আয়োজন তাই শুধু কয়েক দিনের সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হিসেবে নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পণ্য ও সংস্কৃতিকে পর্যটন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে পর্যটন পণ্য হিসেবে স্থানীয় সংস্কৃতিকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, সম্মতি এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন গন্তব্য শ্রীমঙ্গল মূলত চা-বাগান, বনাঞ্চল, হাওর ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের জন্য পরিচিত।
হারমোনি ফেস্টিভ্যাল এ পরিচয়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন মাত্রা যুক্ত করছে।
উৎসব চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের বক্তব্যেও অতিরিক্ত পর্যটক সমাগম এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
পরিকল্পিতভাবে এমন আয়োজন নিয়মিত করা গেলে পর্যটকের অবস্থানকাল বাড়ানো, স্থানীয় পণ্যের বাজার তৈরি এবং প্রচলিত পর্যটন মৌসুমের বাইরে নতুন ভ্রমণ উপলক্ষ তৈরির সুযোগ রয়েছে।
হারমোনি ফেস্টিভ্যালকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে পরিচিত করতে শুধু উৎসব আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগাম প্রচারণা, নির্দিষ্ট তারিখের ধারাবাহিকতা এবং বিদেশি ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবের তারিখ কয়েক মাস আগে নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি ট্যুর অপারেটররা বাংলাদেশ ভ্রমণ প্যাকেজে শ্রীমঙ্গল ও হারমোনি ফেস্টিভ্যালকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে শ্রীমঙ্গলের সংযোগকে সমন্বিতভাবে প্রচার করা গেলে বিদেশি পর্যটকদের কাছে গন্তব্যটি আরও সহজভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
পর্যটনমন্ত্রী এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আগামী বছর আরও বৃহৎ পরিসরে হারমোনি ফেস্টিভ্যাল আয়োজনের আশা প্রকাশ করেছেন।
নির্দিষ্ট সময়ে ধারাবাহিকভাবে উৎসব আয়োজন করা হলে এটি ধীরে ধীরে শ্রীমঙ্গলের নিজস্ব বার্ষিক পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রচারণা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, পর্যটনসেবা উন্নয়ন এবং পরিবেশ ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে হারমোনি ফেস্টিভ্যাল বাংলাদেশের কালচারাল ট্যুরিজম ব্র্যান্ডিংয়ের একটি স্বতন্ত্র আয়োজন হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।
তিন দিনের আয়োজন শেষে ২১ জুন রাতে হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২-এর পর্দা নামে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ ধরনের আয়োজন নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি, কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনের পরিচিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, উৎসব-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রকাশিত প্রতিবেদন
মন্তব্য করুন