aviation
প্রকাশিত: 2 October 2026, 9:53:35 Pm
অনলাইন সংস্করণ

পর্যটনকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপান্তর করতে চাই: পর্যটনমন্ত্রী

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্ভাবনাকে একটি সুপরিকল্পিত, টেকসই এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপ দিতে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণ ও গন্তব্য নিয়ে Tourism Master Plan তৈরির কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে কক্সবাজারকে একটি আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র বা Regional Tourism Hub হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (ICCB) ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৬ উদ্বোধনকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এসব পরিকল্পনার কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা শুধু কয়েকটি পরিচিত গন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের গল্প রয়েছে। এসব সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনশিল্প গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

মাস্টারপ্ল্যানে ১,৪৯৮ পর্যটন আকর্ষণ

পর্যটনমন্ত্রী জানান, সরকার বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণ ও গন্তব্যকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি Tourism Master Plan নিয়ে কাজ করছে।

এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য দেশের পর্যটন সম্পদকে বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন না করে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

পরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান তৈরি বা সংস্কার করাই যথেষ্ট নয়। সেখানে যাতায়াত, আবাসন, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যটন তথ্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলোকেও একই পরিকল্পনার মধ্যে আনা প্রয়োজন।

সরকার এর আগে জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১,৪৯৮টি পর্যটন স্পট চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছিল এবং সমন্বিত পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করার কাজ চলার তথ্য দিয়েছিল।

সুন্দরবন থেকে পাহাড়—বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের শক্তি

মন্ত্রী বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের উদাহরণ হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, কক্সবাজারের দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদ, সিলেটের চা-বাগান, নদী ও জলাভূমি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন।

এর সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকেও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার বড় জায়গা হচ্ছে—একই দেশে সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, হাওর, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্মীয় ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটনের সুযোগ রয়েছে।

এসবকে আলাদা আলাদা গন্তব্য হিসেবে প্রচারের পাশাপাশি পরিকল্পিত পর্যটন সার্কিটে যুক্ত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের অবস্থানকাল বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কক্সবাজারকে Regional Tourism Hub করার পরিকল্পনা

সরকারের পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে কক্সবাজার।

পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, কক্সবাজারকে একটি আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো, সেবা, বিনোদন ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অন্যতম উদ্দেশ্য বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করাও বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

কক্সবাজারকে সত্যিকার অর্থে আঞ্চলিক পর্যটন হাবে রূপ দিতে বিমানবন্দরের অবকাঠামোর পাশাপাশি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা, মানসম্মত হোটেল ও পর্যটনসেবা, সহজ স্থানীয় পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গন্তব্যটির কার্যকর বিপণন গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বেসরকারি বিনিয়োগ ও PPP-তে গুরুত্ব

পর্যটন খাতের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু সরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং Public-Private Partnership (PPP)-কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের নতুন পর্যটন নীতিতেও এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী।

হোটেল-রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র, পর্যটন পরিবহন, ক্রুজ, পর্যটন অবকাঠামো এবং বিভিন্ন গন্তব্যের সেবা উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বড় পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা টেকসই পর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

GDP-তে পর্যটনের অবদান ৮–৯ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য

সরকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন খাতের অবদান ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী একসঙ্গে কাজ করলে এ লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোনো সম্ভব।

পর্যটনের অর্থনৈতিক অবদান বাড়াতে শুধু বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নয়, অভ্যন্তরীণ পর্যটন, পর্যটকের অবস্থানকাল, মাথাপিছু ব্যয়, স্থানীয় পণ্য ও সেবার ব্যবহার এবং পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত সেবা, কার্যকর আন্তর্জাতিক বিপণন এবং পর্যটন খাতের নির্ভরযোগ্য তথ্য।

বিমান যোগাযোগ পর্যটন বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে শক্তিশালী করতে বিমান যোগাযোগের গুরুত্বও বড়।

বিদেশি পর্যটক কোনো গন্তব্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরাসরি ফ্লাইট, বিমানভাড়া, ভিসা প্রক্রিয়া, বিমানবন্দর থেকে পর্যটন গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় এবং স্থানীয় পরিবহন সুবিধা বিবেচনা করেন।

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হলে নিয়মিত আন্তর্জাতিক রুট তৈরির বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

একই সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটসহ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের বিভিন্ন পর্যটন সার্কিটে সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে বিমান পরিবহন ও পর্যটন—দুই খাতই উপকৃত হতে পারে।

১০ দেশের ২০০ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ

তিন দিনব্যাপী ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৬-এ বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা অংশ নিয়েছে।

প্রায় ৩০০টি বুথে বিভিন্ন দেশের পর্যটন গন্তব্য, হোটেল-রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইনস, পর্যটন পণ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হচ্ছে।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মেলা ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের নিজস্ব তথ্যেও এবারের আয়োজন ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ICCB-তে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

‘আগামীকাল নয়, শুরু হোক এখনই’

উদ্বোধনী বক্তব্যে পর্যটনমন্ত্রী সরকারি ও বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “আগামীকাল নয়, শুরু হোক এখনই।”

অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রী বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিসহ পর্যটন খাতের অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের ঘোষিত Tourism Master Plan, কক্সবাজারকে Regional Tourism Hub করার পরিকল্পনা এবং PPP-ভিত্তিক বিনিয়োগ উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা বাড়াতে পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন, গন্তব্য ব্যবস্থাপনা, বিমান যোগাযোগ, সেবার মান এবং ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক প্রচারণাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর বক্তব্য, ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৬ এবং প্রকাশিত সরকারি তথ্য


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বের এক নম্বর বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন সেবা দিচ্ছে সিঙ্গাপুর

1

যশোর বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার দিবস প

2

শাহ আমানত বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ২০৭০ সালের মাস্টারপ্ল্যান,

3

শাহজালালে প্রায় ৩৯৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার, মোবাইল ও ল্যাপটপসহ ত

4

বেবিচকের প্রযুক্তি সহকারী (গ্রেড-১০) পদের আবেদন আপাতত স্থগিত

5

১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরুর পরিকল্পনা, প্র

6

শাহজালালের আয়েই টিকে আছে দেশের অধিকাংশ বিমানবন্দর, বছরে রাজস

7

সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ‘এভিয়েশন সিকিউরিটি উইক–২০২৬’ পালিত

8

দেশের সব বিমানবন্দরে ‘এভিয়েশন সিকিউরিটি উইক’ পালন করছে বেবিচ

9

‘লাগেজের জন্য যাত্রী নয়, যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করবে লাগেজ’: ই

10

রিও ডি জেনেইরোতে পর্যটকবাহী হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ৪

11

বিমানবন্দরে অগ্নি নিরাপত্তা জোরদারে বেবিচকের ১৫ কর্মীর বিশেষ

12

১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, বহরে যুক্ত হবে A350-900 ও

13

বেহালা বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ, আঞ্চলিক ফ্লাইট চালুর

14

জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটি (NCASC) পুনর্গঠন

15

শাহ আমানত বিমানবন্দরে লোডশেডিং নয়, রক্ষণাবেক্ষণের সময়ের ভিডি

16

শাহজালাল বিমানবন্দর ইউনিট কল্যাণ কমিটির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচ

17

বিমানের বহরে বড় পরিবর্তন: বোয়িংয়ের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে ১০ এ

18

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় পেল বেবিচকের চাকরি স্থায়ীকরণের ফাইল

19

সাড়ে সাত বছর পর ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে ফিরছে ইউএস-বাংলা

20