এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সৌদি আরব সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তবে সফরের চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
গত ৬ জুলাই ঢাকায় বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রীও মোহাম্মদ বিন সালমানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভাব্য এই সফর দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও গভীর করার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আনতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও সফরের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরব সফর নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে এসব উচ্চপর্যায়ের সফরের সম্ভাবনা নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ চলছে।
ফলে সৌদি সফর নিশ্চিত হলেও ঠিক কবে অনুষ্ঠিত হবে, সেটি দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।
একইভাবে সৌদি যুবরাজের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরেরও কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি এখন পর্যন্ত ঘোষণা হয়নি।
বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হচ্ছে জনশক্তি ও প্রবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। ফলে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, শ্রমিক কল্যাণ, ভিসা, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে হজ ও ওমরাহর কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সৌদি আরবে যাতায়াত করেন।
এ কারণে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শুধু রাষ্ট্রীয় কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে বিমান চলাচল, পর্যটন, ধর্মীয় ভ্রমণ ও শ্রমবাজার।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক aviation market-এ সৌদি আরব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য।
ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের একাধিক শহরে যাত্রী চলাচল রয়েছে। হজ মৌসুমে এই চাহিদা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী, ওমরাহযাত্রী এবং হজযাত্রী—এই তিনটি বড় passenger segment বাংলাদেশ-সৌদি বিমানবাজারকে অন্য অনেক আন্তর্জাতিক রুট থেকে আলাদা করেছে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হলে ভবিষ্যতে business travel-এর চাহিদাও বাড়তে পারে।
তবে কূটনৈতিক সফর হলেই নতুন ফ্লাইট বা অতিরিক্ত ফ্রিকোয়েন্সি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হবে—এমন নয়। নতুন বিমানসেবা নির্ভর করবে যাত্রী চাহিদা, এয়ারলাইনের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, traffic rights এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।
সৌদি রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সহযোগিতা প্রচলিত জনশক্তি খাতের বাইরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি খাতেও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরব বর্তমানে Vision 2030-এর আওতায় নিজস্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের রূপান্তর বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ যদি সৌদি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চায়, তাহলে সম্ভাব্য প্রকল্পের পাশাপাশি বিনিয়োগের নিয়ম, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জমি ও অবকাঠামো, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সৌদি বিনিয়োগের আলোচনায় transport ও logistics খাতের উল্লেখ বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পের জন্যও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিমানবন্দর অবকাঠামো সম্প্রসারণ, cargo handling আধুনিকায়ন, logistics network উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবও তার বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতে বড় বিনিয়োগ করছে।
দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে বিমানবন্দরসেবা, এয়ার কার্গো, লজিস্টিকস, পর্যটন কিংবা aviation-related investment নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প তৈরি হলে সেটি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন একটি মাত্রা দিতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট aviation investment agreement স্বাক্ষরিত হবে—এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে পর্যটনের একটি বিশেষ অংশ হচ্ছে religious travel।
প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ হজ ও ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে যান। ফলে visa processing, flight capacity, airport handling, accommodation, ground transport এবং baggage management-এর মতো বিষয় দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে হজ মৌসুমে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের কারণে বাংলাদেশের বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনগুলোর ওপর বড় ধরনের operational pressure তৈরি হয়।
জুলাইয়ের আমন্ত্রণের পরও বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বিন আবদুল্লাহ আল সৌদের বৈঠক হয়। সেখানে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সৌদি সফরের আগে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সফরের আলোচ্যসূচি এবং এর পরবর্তী বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে থাকতে পারে বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, শ্রমিক কল্যাণ, বিমান যোগাযোগ, পর্যটন ও লজিস্টিকস।
তবে এসব ক্ষেত্রের কোনগুলো প্রধানমন্ত্রীর সফরের আনুষ্ঠানিক agenda-তে থাকবে, তা সফরসূচি চূড়ান্ত হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য হলো—সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সফরের সময় নির্ধারণে দুই সরকার আলোচনা করছে। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজকেও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সফরটি অনুষ্ঠিত হলে এর বাস্তব গুরুত্ব নির্ভর করবে ঘোষিত বিনিয়োগ বা সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কতটা সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, চুক্তি এবং বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগে রূপ নেয় তার ওপর।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
মন্তব্য করুন