এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
আঞ্চলিক আকাশসীমার বিধিনিষেধ ও সাম্প্রতিক অপারেশনাল চ্যালেঞ্জের প্রভাব কাটিয়ে যাত্রী পরিবহনে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার করেছে কাতার এয়ারওয়েজ। এখন বহর আধুনিকায়ন, নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন, দ্রুতগতির ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির নতুন পর্যায়ে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনটি।
কাতার এয়ারওয়েজ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হামাদ আলী আল-খাতের জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে এয়ারলাইনটির বহরে ১৩৮টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। এর মধ্যে Airbus A350-1000 ও Boeing 777-9-এর মতো নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ রয়েছে।
দোহায় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিভিন্ন অপারেশনাল স্থাপনা পরিদর্শন উপলক্ষে আয়োজিত এক মিডিয়া ওপেন ডে-তে কাতার এয়ারওয়েজের মধ্যমেয়াদি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা তুলে ধরেন আল-খাতের।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে পাওয়া ১৩৮টি নতুন উড়োজাহাজ এয়ারলাইনটির আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে। বহর আধুনিকায়নে Airbus A350-1000-এর পাশাপাশি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত Boeing 777-9 যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আরও দীর্ঘমেয়াদে কাতার এয়ারওয়েজের Airbus ও Boeing মিলিয়ে প্রায় ৪১০টি উড়োজাহাজের অর্ডার রয়েছে, যা আগামী দশকগুলোতে এয়ারলাইনটির বহর নবায়ন ও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে।
কাতার এয়ারওয়েজের বহর পরিকল্পনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে narrow-body উড়োজাহাজের ব্যবহার বৃদ্ধি। আল-খাতের জানিয়েছেন, এয়ারলাইনটি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ৫০টি Airbus A321LR পাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
A321LR তুলনামূলক ছোট narrow-body উড়োজাহাজ হলেও এটি প্রচলিত স্বল্পপাল্লার narrow-body বিমানের তুলনায় দীর্ঘ দূরত্বে উড়তে সক্ষম। ফলে এমন কিছু secondary market বা তুলনামূলক কম যাত্রী চাহিদার গন্তব্যে কাতার এয়ারওয়েজ ফ্লাইট চালাতে পারবে, যেখানে বড় wide-body উড়োজাহাজ পরিচালনা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক নাও হতে পারে।
এই বহর যুক্ত হলে দোহাকে কেন্দ্র করে নতুন শহরে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সুযোগ বাড়তে পারে।
কাতার এয়ারওয়েজের পাশাপাশি এর প্রধান হাব হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও (DOH) যাত্রী চলাচল দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে।
আল-খাতেরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরটি বর্তমানে দিনে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো দোহায় পুনরায় ফ্লাইট বাড়ানোর সঙ্গে এই যাত্রী প্রবাহও বেড়েছে।
একই সময়ে কাতার এয়ারওয়েজের নেটওয়ার্ক মধ্য জুনের প্রায় ৬০টি গন্তব্য থেকে পুনরুদ্ধার হয়ে প্রায় ১৬০টি গন্তব্যে পৌঁছেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এয়ারলাইনটির যাত্রী পরিবহনের ‘৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার’ বলতে কোভিড-১৯ মহামারির আগের অবস্থার তুলনা বোঝানো হয়নি। আল-খাতেরের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংকট ও আকাশসীমা বিঘ্নের আগের/গত বছরের যাত্রী পর্যায়ের তুলনায় পুনরুদ্ধারের হিসাব।
যাত্রী অভিজ্ঞতায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগ করছে কাতার এয়ারওয়েজ।
এয়ারলাইনটির ১৫০টি wide-body উড়োজাহাজে ইতোমধ্যে Starlink স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে Boeing 777, Airbus A350 এবং Boeing 787 পরিবারের উড়োজাহাজ রয়েছে।
কাতার এয়ারওয়েজের তথ্য অনুযায়ী, এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় Starlink-সজ্জিত wide-body বহর। Boeing 787-8 বহরে Starlink স্থাপনের কাজও শেষ হয়েছে এবং Boeing 787-9-এ এই প্রযুক্তি চালু করা প্রথম এয়ারলাইন হওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে সেবাটি চালুর পর ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৮৬ হাজারের বেশি ফ্লাইটে ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি যাত্রী সংযোগ ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছে এয়ারলাইনটি।
কাতার এয়ারওয়েজের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা পরিস্থিতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ।
আল-খাতের জানিয়েছেন, আকাশসীমায় অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু ফ্লাইটে বর্তমানে প্রায় ১০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এয়ারলাইনটির Integrated Operations Centre থেকে রুট পরিবর্তন, ফ্লাইট সূচি সমন্বয় এবং ক্রু ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে কাতার এয়ারওয়েজের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, আকাশসীমার বিধিনিষেধের মধ্যে এয়ারলাইনটির available seat kilometres বা যাত্রী পরিবহন সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বছরওয়ারি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
বহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে কাতার এয়ারওয়েজ পুরোনো ও তুলনামূলক বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী Airbus A330 যাত্রীবাহী উড়োজাহাজও বহর থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও আঞ্চলিক অপারেশনাল পরিস্থিতির মধ্যে এয়ারলাইনটি নতুন ও বেশি fuel-efficient উড়োজাহাজে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত ছয়টি উড়োজাহাজ বহর ছাড়ার বিপরীতে ১৯টি নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহ পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে ১৩৮টি নতুন উড়োজাহাজের পরিকল্পনা শুধু বহরের আকার বাড়ানোর বিষয় নয়; পুরোনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন এবং অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কাতার এয়ারওয়েজের প্রিমিয়াম যাত্রীসেবার অন্যতম পরিচিত পণ্য Qsuite-এর নতুন প্রজন্মও আগামী গ্রীষ্মে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন Qsuite-এর মাধ্যমে বিজনেস ক্লাসে আরও উন্নত ব্যক্তিগত জায়গা, আরাম ও প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এয়ারলাইনটি।
এর মাধ্যমে বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি premium passenger experience-এ নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে কাতার এয়ারওয়েজ।
কাতার এয়ারওয়েজের আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে বহরে বিভিন্ন আকার ও সক্ষমতার উড়োজাহাজের সংযোজন।
A350-1000 ও 777-9-এর মতো wide-body উড়োজাহাজ দীর্ঘপাল্লার ও উচ্চ চাহিদার রুটে সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। অন্যদিকে A321LR-এর মতো narrow-body উড়োজাহাজ তুলনামূলক ছোট বাজার ও secondary airport-এ ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি করবে।
ফলে একই বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মাধ্যমে এয়ারলাইনটি একদিকে বড় আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে এমন নতুন গন্তব্যে প্রবেশের সুযোগ পাবে যেখানে wide-body উড়োজাহাজ ব্যবহার অর্থনৈতিকভাবে কঠিন।
Starlink সম্প্রসারণ, নতুন Qsuite, আধুনিক উড়োজাহাজ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা মিলিয়ে আগামী পাঁচ বছরকে তাই কাতার এয়ারওয়েজের জন্য বড় ধরনের fleet renewal ও network expansion-এর সময়কাল হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: Qatar Airways, Qatar News Agency (QNA), Qatar Civil Aviation Authority ও Reuters
মন্তব্য করুন