এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি আগামী ৭ অক্টোবর স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে এর মধ্য দিয়ে বর্তমানে মূলত বোয়িংনির্ভর জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির জেট বহরে আবারও এয়ারবাস যুক্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় mixed fleet গড়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঢাকার একটি হোটেলে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত তারিখ ও বাণিজ্যিক শর্তগুলো চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা না করাই সমীচীন।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে রয়েছে চারটি Airbus A350-900 widebody এবং ছয়টি A321neo narrowbody উড়োজাহাজ।
A350-900 মূলত দীর্ঘপাল্লার ও বেশি যাত্রীচাহিদার আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে তুলনামূলক ছোট A321neo আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার রুটে ব্যবহারের মাধ্যমে রুটভেদে উপযুক্ত সক্ষমতার উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ দিতে পারে বিমানকে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এর আগে নিশ্চিত করেছিলেন, বিমান ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে এবং অক্টোবরে এ বিষয়ে চুক্তির লক্ষ্য রয়েছে।
প্রস্তাবিত বহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একই সঙ্গে widebody ও narrowbody উড়োজাহাজ নেওয়া।
A350-900-এর মতো widebody aircraft দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে বেশি যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা যায়। ফলে বিদ্যমান দীর্ঘপাল্লার রুটে সক্ষমতা বাড়ানো অথবা পর্যাপ্ত যাত্রীচাহিদা থাকলে নতুন দূরপাল্লার গন্তব্য চালুর ক্ষেত্রে এটি কাজে আসতে পারে।
অন্যদিকে A321neo single-aisle বা narrowbody উড়োজাহাজ। আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার এমন অনেক রুট রয়েছে যেখানে বড় widebody পরিচালনার মতো যাত্রীচাহিদা সবসময় থাকে না। সেখানে ছোট উড়োজাহাজ ব্যবহার করে frequency ও seat capacity চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার সুযোগ থাকে।
তবে কোন মডেল কোন নির্দিষ্ট রুটে ব্যবহার করা হবে, সেটি ভবিষ্যতের network planning, যাত্রীচাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতার ওপর নির্ভর করবে।
বিমানের বর্তমান জেট বহর মূলত Boeing 777, 787 এবং 737 পরিবারের উড়োজাহাজনির্ভর। এর আগে বিমান Airbus A310 পরিচালনা করলেও সেগুলো অনেক আগেই বহর থেকে বিদায় নিয়েছে।
ফলে নতুন A350 ও A321neo যুক্ত হওয়া শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনা নয়; এটি বিমানের fleet strategy-তেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে।
এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি হলে একই সঙ্গে Boeing ও Airbus aircraft নিয়ে বড় পরিসরে mixed fleet পরিচালনার পথে যাবে বিমান।
এর সুবিধা হলো, বিভিন্ন রুট ও যাত্রীচাহিদার জন্য আরও বৈচিত্র্যময় aircraft option পাওয়া যাবে। আবার এর সঙ্গে বাড়তি operational complexity-ও তৈরি হবে।
সরকারের দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এয়ারবাস উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ ২০৩৩ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে।
নতুন বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে অর্ডার দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক delivery পাওয়া সাধারণত সম্ভব হয় না। নির্মাতাদের production backlog এবং নির্ধারিত manufacturing slot-এর কারণে কয়েক বছর আগে থেকেই অর্ডার নিশ্চিত করতে হয়।
ফলে ১০টি এয়ারবাসের পরিকল্পনাটি বিমানের তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানের পরিবর্তে মূলত দীর্ঘমেয়াদি fleet expansion-এর অংশ।
স্বল্পমেয়াদি উড়োজাহাজ চাহিদা মেটাতে বিমান আলাদাভাবে aircraft lease নেওয়ার চেষ্টাও করছে।
১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজের প্যাকেজটির চূড়ান্ত বাণিজ্যিক মূল্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বড় aircraft procurement-এ শুধু উড়োজাহাজের মূল দামই চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণ করে না। ইঞ্জিন, cabin configuration, spare parts, training, maintenance support, financing এবং অন্যান্য commercial terms-এর ওপর প্রকৃত চুক্তিমূল্য নির্ভর করতে পারে।
এ কারণে manufacturer-এর পুরোনো catalogue বা list price দিয়ে চূড়ান্ত ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিমান বা সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ও বাণিজ্যিক শর্ত প্রকাশ করা হলে প্রকৃত বিনিয়োগের আকার আরও পরিষ্কার হবে।
এয়ারবাসের সম্ভাব্য চুক্তিটি এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন বিমান ইতোমধ্যে Boeing-এর কাছ থেকে বড় আকারের নতুন বহর সংগ্রহের পথে রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে বিমান ১৪টি Boeing aircraft অর্ডার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
৮টি Boeing 787-10, ২টি Boeing 787-9 এবং ৪টি Boeing 737-8।
পরবর্তী পর্যায়ে আরও ১১টি Boeing কেনার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি 787-10 এবং ৬টি 737-8।
দুই ধাপ মিলিয়ে Boeing-এর কাছে বিমানের নতুন উড়োজাহাজের অর্ডার দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে।
এর সঙ্গে প্রস্তাবিত ১০টি Airbus যোগ হলে দীর্ঘমেয়াদি নতুন aircraft pipeline দাঁড়াবে ৩৫টিতে।
মডেল অনুযায়ী হিসাব করলে এই ৩৫টির মধ্যে ১৮টি widebody এবং ১৭টি narrowbody উড়োজাহাজ হওয়ার কথা।
এটি বিমানের ইতিহাসে অত্যন্ত বড় fleet expansion programme হিসেবে বিবেচিত হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজের pipeline তৈরি হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব উড়োজাহাজ দ্রুত বা একই সময়ে বিমানের বহরে যুক্ত হবে।
Boeing-এর aircraft delivery কয়েক বছর পর থেকে শুরু হওয়ার কথা। Airbus-এর ক্ষেত্রেও ২০৩৩ সালের আগে delivery শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না।
ফলে এটি মূলত আগামী এক দশকজুড়ে বিমানের fleet renewal ও expansion-এর পরিকল্পনা।
এই সময়ের মধ্যে পুরোনো aircraft retirement, lease arrangement এবং নতুন aircraft delivery মিলিয়ে বিমানের প্রকৃত বহরের আকার নির্ধারিত হবে।
Airbus যুক্ত হলে বিমানের সামনে বড় একটি operational challenge হবে একই সঙ্গে দুই নির্মাতার aircraft family পরিচালনা করা।
A350 ও A321neo পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট aircraft type অনুযায়ী pilot training, engineer ও maintenance capability, spare parts inventory, technical support এবং ground support ব্যবস্থা।
Boeing ও Airbus cockpit এবং aircraft systems এক নয়। ফলে একটি Boeing-qualified pilot সরাসরি A350 বা A321neo পরিচালনা করতে পারবেন না; প্রয়োজনীয় type-specific training ও certification লাগবে।
প্রকৌশল ও maintenance ব্যবস্থাপনাতেও একই ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।
ফলে mixed fleet route planning-এ নমনীয়তা দিলেও training, maintenance ও logistics-এর কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় ও জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত শুধু কতটি উড়োজাহাজ কেনা হলো, সেটি নয়।
৩৫টি নতুন aircraft-এর সক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে পর্যাপ্ত লাভজনক route network, passenger demand, transit traffic, cargo business এবং কার্যকর revenue management প্রয়োজন হবে।
নতুন long-haul aircraft যুক্ত হলে শুধু নতুন গন্তব্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট হবে না। প্রতিটি রুটের passenger yield, load factor, operating cost এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও বিবেচনা করতে হবে।
একইভাবে narrowbody fleet বাড়লে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উচ্চ চাহিদার বাজারে frequency বাড়ানো বা নতুন গন্তব্য তৈরির সুযোগ আসতে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ দেশের aviation infrastructure সম্প্রসারণও ভবিষ্যতের এই fleet growth সামলানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি শেষ পর্যন্ত ৭ অক্টোবর সম্পন্ন হলে সেটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।
একদিকে Boeing-এর সঙ্গে ২৫টি নতুন aircraft-এর অর্ডার, অন্যদিকে Airbus-এর ১০টি aircraft—দুই নির্মাতাকে নিয়ে বিমান দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় ও বৈচিত্র্যময় বহর গড়ার পথে এগোচ্ছে।
তবে এই বিশাল বিনিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু aircraft delivery দিয়ে নয়। নতুন উড়োজাহাজগুলো কতটা লাভজনকভাবে ব্যবহার করা যায়, নতুন বাজার তৈরি করা যায় কি না এবং বাড়তি সক্ষমতাকে টেকসই রাজস্ব ও উন্নত যাত্রীসেবায় রূপান্তর করা যায় কি না—সেটিই হবে বিমানের বড় পরীক্ষা।
সূত্র: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্ট সূত্র
মন্তব্য করুন