এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে যাত্রীদের ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও বিভিন্ন অনবোর্ড সেবা দিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫.৩১৬ বিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ১.৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে এমিরেটস। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে এয়ারলাইনটির ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ যাত্রীদের খাবার ও অন্যান্য ইনফ্লাইট সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে দুবাইভিত্তিক এয়ারলাইনটি।
এমিরেটসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, আগের বছর ‘Inflight Catering and Services’ খাতে ব্যয় ছিল ৪.৭৪৬ বিলিয়ন দিরহাম। এক বছরে তা প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন দিরহাম বেড়েছে। একই সময়ে এয়ারলাইনটি রেকর্ড রাজস্ব ও মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং যাত্রী অভিজ্ঞতা উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
বার্ষিক ৫.৩১৬ বিলিয়ন দিরহাম ব্যয়কে মাসিক হিসাবে ভাগ করলে এমিরেটসের ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও সেবায় গড় ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪৩ মিলিয়ন দিরহাম। দৈনিক হিসাবে এটি প্রায় ১৪.৬ মিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ৩.৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রতিদিন এ খাতে প্রায় ১.৫৬ মিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার ডলার বেশি ব্যয় করেছে এয়ারলাইনটি।
তবে এই হিসাব থেকে একজন যাত্রীর খাবারের পেছনে এমিরেটস কত অর্থ ব্যয় করেছে, সেটি সরাসরি নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ হিসাবের খাতটি শুধু খাবার ও পানীয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এমিরেটসের আর্থিক বিবরণীতে ব্যয়টির নাম ‘Inflight Catering and Services’। ফলে ১.৪৫ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থকে শুধু যাত্রীদের খাবারের খরচ হিসেবে দেখা সঠিক হবে না।
এটি যাত্রীদের ইনফ্লাইট ক্যাটারিংয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা ও অনবোর্ড পণ্য সরবরাহের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা একটি বিস্তৃত হিসাব খাত।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এমিরেটসের মোট পরিচালন ব্যয় ছিল ১০৮.১২৯ বিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ২৯.৪৪ বিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ৪.৯ শতাংশ গেছে ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও সেবায়।
এমিরেটসের পরিচালন ব্যয়ের তালিকায় Inflight Catering and Services ছিল সপ্তম বৃহত্তম ব্যয়ের খাত।
এর চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে জেট ফুয়েল, কর্মী, depreciation and amortisation, sales and marketing, handling এবং aircraft maintenance-এ।
শুধু উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে এমিরেটসের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬.০৩ বিলিয়ন দিরহাম বা ১.৬৪ বিলিয়ন ডলার—যা ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও সেবার মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
আর্থিক হিসাবের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এমিরেটসের সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও সেবার ব্যয় অনেক দ্রুত বেড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এয়ারলাইনটির মোট পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বিপরীতে Inflight Catering and Services খাতে ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশ।
একই সময়ে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত জেট ফুয়েলের খরচ উল্টো কমেছে। জ্বালানি ব্যয় আগের অর্থবছরের প্রায় ৩২.৬ বিলিয়ন দিরহাম থেকে কমে ৩১.২ বিলিয়ন দিরহামে নেমেছে।
ফলে সামগ্রিক ব্যয় তুলনামূলক সীমিত হারে বাড়লেও যাত্রীসেবা-সংশ্লিষ্ট এই নির্দিষ্ট খাতে দ্বিগুণ অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
অর্থবছরটিতে এমিরেটস ৫৩.২ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ৩২ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে। যদিও আগের বছরের তুলনায় যাত্রীসংখ্যা প্রায় ১ শতাংশ কম ছিল, passenger yield বেড়েছে ৪ শতাংশ।
এ সময় এয়ারলাইনটির Passenger Seat Factor ছিল ৭৮.৪ শতাংশ, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৭৮.৯ শতাংশ।
অর্থাৎ ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও সেবায় ১২ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি শুধু যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বরং নেটওয়ার্ক, পণ্যের মান, সেবার ধরন এবং যাত্রী অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই অর্থবছরে নিজেদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কও সম্প্রসারণ করেছে এমিরেটস। নতুন করে Da Nang, Hangzhou, Siem Reap এবং Shenzhen-এ ফ্লাইট চালু করেছে এয়ারলাইনটি।
ফলে মার্চের শেষ নাগাদ এমিরেটসের নেটওয়ার্ক ৮০টি দেশের ১৫২টি শহরে পৌঁছায়। এ সময় যাত্রী ও কার্গো মিলিয়ে মোট পরিবহন সক্ষমতা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
বিশ্বের বিস্তৃত long-haul নেটওয়ার্ক পরিচালনার কারণে এমিরেটসের ইনফ্লাইট ক্যাটারিং কার্যক্রমও বড় পরিসরের। দূরপাল্লার ফ্লাইটে একাধিক meal service, বিভিন্ন cabin class এবং গন্তব্যভেদে আলাদা খাবারের প্রয়োজনীয়তা এই কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তোলে।
ইনফ্লাইট সেবায় ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উড়োজাহাজের কেবিন আধুনিকায়নেও বড় বিনিয়োগ করছে এমিরেটস।
এয়ারলাইনটির ৫ বিলিয়ন ডলারের retrofit programme-এর আওতায় ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৯১টি উড়োজাহাজের পূর্ণাঙ্গ কেবিন সংস্কার শেষ হয়েছে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে পুরোনো উড়োজাহাজের কেবিন নতুন করে সাজানো এবং Premium Economy-সহ নতুন পণ্য যুক্ত করা হচ্ছে।
একই সময়ে ইনফ্লাইট কানেক্টিভিটিতেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এয়ারলাইনটি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বহরে Starlink উচ্চগতির Wi-Fi যুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে এমিরেটস এবং ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২১টি উড়োজাহাজে সেবাটি চালু হয়।
বড় অঙ্কের যাত্রীসেবা ও বহর বিনিয়োগের মধ্যেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আর্থিক ফলাফল অর্জন করেছে এমিরেটস।
এয়ারলাইনটির রাজস্ব বেড়ে ১৩০.৯ বিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ৩৫.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কর-পূর্ব মুনাফা হয়েছে ২২.৮ বিলিয়ন দিরহাম বা ৬.২ বিলিয়ন ডলার।
কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৯.৭ বিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ৫.৪ বিলিয়ন ডলার, যা এমিরেটসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ফলে ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ও সেবায় বছরে প্রায় ১.৪৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় শুধু বড় একটি খরচের হিসাব নয়; এটি এমিরেটসের সামগ্রিক ব্যবসায়িক কৌশলে যাত্রী অভিজ্ঞতার গুরুত্বও তুলে ধরে। বিশেষ করে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কেবিন আধুনিকায়ন এবং নতুন অনবোর্ড প্রযুক্তির পাশাপাশি এ খাতে ১২ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে প্রতিযোগিতামূলক long-haul বাজারে যাত্রীসেবায় বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে এয়ারলাইনটি।
সূত্র: Emirates Group Annual Report 2025-26 ও Gulf News
মন্তব্য করুন