এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকালে বাংলাদেশ ও সুদানসহ বিভিন্ন দেশের দুই শতাধিক অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে গ্রিসের কোস্টগার্ড। পৃথক উদ্ধার অভিযানের মধ্যে অন্তত দুটি নৌকা থেকে ৭২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্স (Frontex)-এর একটি নজরদারি বিমান সাগরে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা শনাক্ত করে। পরে স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় নৌকাটিতে থাকা ৪০ জনকে উদ্ধার করে গ্রিসের ইয়েরাপেত্রা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর আগে পৃথক আরও দুটি অভিযানে মোট ১১২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। ওই দুই অভিযানে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৭২ জন ছিলেন বাংলাদেশি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম অভিযানে একটি নৌকা থেকে ৫৬ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ২৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন।
দ্বিতীয় আরেকটি অভিযানে আরও ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। ওই নৌকায় ৪৭ জন বাংলাদেশি ছিলেন।
ফলে এই দুই অভিযানেই মোট ৭২ বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ ৪০ জনকে উদ্ধারের ঘটনায় তাদের জাতীয়তার পূর্ণাঙ্গ বিভাজন তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। তাই সবগুলো অভিযান মিলিয়ে বাংলাদেশির প্রকৃত সংখ্যা ৭২-এর বেশি কি না, তা স্পষ্ট নয়।
উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের গ্রিসের হেরাক্লিওন বন্দরের একটি অস্থায়ী অভ্যর্থনা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
সেখানে তাদের পরিচয় ও জাতীয়তা যাচাইসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অনিয়মিতভাবে ইউরোপীয় কোনো দেশে পৌঁছানোর পর একজন ব্যক্তিকে কী ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, তা তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, অভিবাসন অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের ওপর নির্ভর করে।
ফলে সাগরপথে গ্রিসে পৌঁছাতে পারলেই ইউরোপে বৈধভাবে বসবাস বা কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হয় না।
প্রাথমিক তদন্তের বরাতে জানানো হয়েছে, অভিবাসীবাহী একটি নৌকা লিবিয়ার উপকূলীয় শহর তোব্রুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল।
উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে পৌঁছানোর চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ছোট নৌযান, পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কারণে এই রুটে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাগরপথে নেওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মার্কিন ডলার নেওয়া হয়েছিল।
এই অর্থ কারা নিয়েছে এবং পুরো যাত্রাটি কীভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ।
মানবপাচার বা migrant smuggling চক্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অর্থের পরিমাণকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সব যাত্রীর ক্ষেত্রে একই বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অভিবাসীদের অনিয়মিতভাবে গ্রিসে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৬ বছর বয়সী এক সুদানি কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে গ্রিক পুলিশ।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তাধীন। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার ভূমিকা ও দায় নির্ধারিত হবে।
অভিবাসীবাহী নৌকায় থাকা কাউকে নৌকা পরিচালনার অভিযোগে আটক করা হলেও তিনি বৃহত্তর পাচার বা চোরাচালান নেটওয়ার্কের কোন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন, সেটি তদন্তের বিষয়।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে বৈধ বা অবৈধভাবে অন্য কোনো দেশে নেওয়া এবং পরে স্থল বা সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের যাত্রায় একজন অভিবাসী একাধিক দেশে আটকা পড়া, অর্থ হারানো, শারীরিক নির্যাতন, আটক কিংবা জীবনহানির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিশেষ করে ‘লিবিয়া থেকে নৌকায় ইউরোপে পৌঁছে দিলেই বৈধ হওয়া যাবে’—এ ধরনের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কোনো দেশে পৌঁছানো এবং সেখানে বৈধভাবে বসবাস বা কাজ করার অনুমতি পাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
ইউরোপে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের বৈধ চাকরির চুক্তি, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, Work Permit, উপযুক্ত ভিসা এবং বাংলাদেশের প্রযোজ্য সরকারি অভিবাসন প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো দালাল যদি প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকার কোনো দেশে নিয়ে পরে সড়ক বা সাগরপথে ইউরোপে প্রবেশ করানোর প্রস্তাব দেয়, সেটি বড় ধরনের সতর্কসংকেত।
একইভাবে শুধু বিমান টিকিট বা কোনো দেশের ভিজিট ভিসা দেখিয়ে ইউরোপে নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া অর্থ লেনদেন করা ঝুঁকিপূর্ণ।
গ্রিসে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের ঘটনা আবারও দেখিয়েছে, অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা শুধু আইনগত জটিলতাই নয়, সমুদ্রযাত্রায় সরাসরি জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর
মন্তব্য করুন