এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে নির্মাণকাজের সময় দুর্ঘটনাবশত গুরুত্বপূর্ণ ফাইবার অপটিক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে নিউইয়র্ক ও ফিলাডেলফিয়াসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে শত শত ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আকাশসীমায় ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করতে বাধ্য হয়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং সেবা FlightAware-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে নিউইয়র্ক অঞ্চলের নেওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৬৮টি ফ্লাইট বাতিল এবং ৯৭টি বিলম্বিত হয়। একই সময়ে ফিলাডেলফিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬৩টি ফ্লাইট বাতিল এবং ১৮৯টি বিলম্বিত হয়।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিউ জার্সিতে রেল পরিষেবা সংস্থা Amtrak-এর একটি নির্মাণ দল কাজ করার সময় দুর্ঘটনাবশত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফাইবার অপটিক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত করে।
লাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় টেলিযোগাযোগে সমস্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতিতে নিরাপদ ব্যবধানে উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় FAA বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করে।
বিমান চলাচলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সঙ্গে পাইলট এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ ধরনের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় সমস্যা হলে নিরাপত্তার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিচালিত ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে।
FAA প্রধান ব্রায়ান বেডফোর্ড জানিয়েছেন, ঘটনার পর দুটি পৃথক প্রযুক্তিগত সমস্যার বিষয় সামনে আসে।
প্রথমে মূল টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। পরে তদন্তে জানা যায়, নির্মাণকাজের সময় ব্যাকআপ ফাইবার লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মূল যোগাযোগব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ার পর বিকল্প ব্যবস্থায় দ্রুত পুরো সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
বেডফোর্ড জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাকআপ ফাইবার লাইন পুরোপুরি মেরামত করতে প্রায় ১৩ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে এর মধ্যেই প্রাথমিক যোগাযোগব্যবস্থা সচল করে বিমান চলাচলের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছিল।
মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া বিমানবন্দর এবং ফিলাডেলফিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়।
তবে নেওয়ার্ক লিবার্টি ও জন এফ কেনেডি (JFK) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে উড়োজাহাজ ওঠানামা সীমিত রাখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিমান চলাচল ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যস্ত এবং পরস্পর সংযুক্ত। ফলে নিউইয়র্ক অঞ্চলের বড় বিমানবন্দরগুলোর একটিতে দীর্ঘ বিলম্ব তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে অন্য বিমানবন্দর ও অভ্যন্তরীণ রুটেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল শুধু রাডার বা কন্ট্রোল টাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, রাডার ব্যবস্থা, ভয়েস কমিউনিকেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদানে বিস্তৃত টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়।
এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ লিংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে FAA সাধারণত নিরাপত্তা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট আকাশসীমায় একসঙ্গে পরিচালিত ফ্লাইটের সংখ্যা কমাতে পারে। এর ফল হিসেবে গ্রাউন্ড স্টপ, গ্রাউন্ড ডিলে অথবা ফ্লাইটের মধ্যে ব্যবধান বাড়ানোর মতো ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনায় মূল সংযোগের পাশাপাশি ব্যাকআপ ফাইবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কার্যকর ও ভৌগোলিকভাবে সুরক্ষিত ব্যাকআপ যোগাযোগব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
ফ্লাইট বাতিল ও দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরগুলোতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েন। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটের পাশাপাশি সংযোগকারী ফ্লাইটের যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে নেওয়ার্ক, JFK, লাগার্ডিয়া ও ফিলাডেলফিয়ার মতো বড় বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এমন বিঘ্নের প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত রুট নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা আধুনিক বিমান চলাচলে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর নিরবচ্ছিন্নতা এবং কার্যকর ব্যাকআপ ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও নতুন করে সামনে এনেছে।
সূত্র: FAA, মার্কিন পরিবহন বিভাগ, FlightAware
মন্তব্য করুন