এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দেশের অন্যতম দুই পর্যটন অঞ্চল সিলেট ও কক্সবাজারকে সরাসরি আকাশপথে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম।
গত ৫ জুলাই সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঢাকা–সিলেট–ম্যানচেস্টার ফ্লাইট পুনরায় চালু উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান। সেদিন চার মাসের বিরতির পর বিমানের ম্যানচেস্টার রুট পুনরায় চালু হয়।
পর্যটনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সিলেটের পর্যটন, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সিলেট–কক্সবাজার সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে নতুন একটি বিমান রুট যুক্ত হবে।
সিলেট ও কক্সবাজার বাংলাদেশের দুটি ভিন্ন ধরনের পর্যটন অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে।
সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি ও হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপরীতে কক্সবাজারের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত ও উপকূলীয় পর্যটন।
বর্তমানে দুই অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ না থাকায় অধিকাংশ বিমানযাত্রীকে ঢাকা হয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে অতিরিক্ত transit, অপেক্ষার সময় এবং ভ্রমণ ব্যয় যুক্ত হতে পারে।
সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে একজন পর্যটক একই সফরে সিলেট ও কক্সবাজারকে যুক্ত করে ভ্রমণ পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন। পর্যটন খাতের জন্য এটি একটি multi-destination domestic tourism circuit তৈরির সুযোগ হতে পারে।
সিলেট–কক্সবাজার রুটের সম্ভাব্য যাত্রী শুধু স্থানীয় পর্যটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের একটি অংশ পরিবার নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে ভ্রমণ করেন।
ম্যানচেস্টার থেকে সরাসরি সিলেটে আসা কোনো প্রবাসী যদি সেখান থেকেই কক্সবাজারের ফ্লাইট নিতে পারেন, তাহলে ঢাকা হয়ে আলাদা যাত্রার প্রয়োজন কমতে পারে।
একইভাবে কক্সবাজার ভ্রমণ শেষে সরাসরি সিলেটে ফিরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরার সুযোগ তৈরি হলে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠতে পারে।
সিলেট–কক্সবাজার রুটের পরিকল্পনার ঘোষণা আসে এমন দিনে, যেদিন চার মাসের বিরতির পর পুনরায় চালু হয় বিমানের ঢাকা–সিলেট–ম্যানচেস্টার ফ্লাইট।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের BG-208 ফ্লাইটটি ম্যানচেস্টার থেকে ২৬৮ যাত্রী নিয়ে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ২২৭ জন সিলেটে নেমে যান এবং বাকি ৪১ জন ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখেন।
বিমান রুটটিতে Boeing 787-8 দিয়ে সপ্তাহে দুইটি ফ্লাইটের সূচি রেখেছিল।
সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক যুক্তরাজ্যপ্রবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদার কারণে ম্যানচেস্টার রুটটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সরকার ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের কথাও বলছে।
পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিমানবন্দরটির উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনকে সিলেটে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন হলেই বিদেশি এয়ারলাইন ফ্লাইট চালাবে—বিষয়টি এমন নয়। একটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন নতুন রুট চালুর আগে সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, পরিচালন ব্যয়, বিমানবন্দর চার্জ, ground handling, slot, aircraft availability এবং রুটটির বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে।
ফলে সিলেটকে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক aviation gateway হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি টেকসই যাত্রী চাহিদা ও প্রতিযোগিতামূলক বিমানবন্দরসেবা গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের বিমানভাড়া নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে প্রবাসীদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে একই সময় ও কাছাকাছি গন্তব্যের ভাড়ার পার্থক্য নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার কথা এর আগে জানিয়েছিলেন পর্যটনমন্ত্রী। সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা এবং বিমানভাড়া আরও সহনীয় করার উপায় নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
তবে বিমানভাড়া সরকারিভাবে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে নামিয়ে আনা হবে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এয়ারলাইনগুলোর ভাড়া সাধারণত যাত্রী চাহিদা, আসনের প্রাপ্যতা, জ্বালানি ব্যয়, মৌসুম, পরিচালন ব্যয় এবং বুকিংয়ের সময়ের ওপর পরিবর্তিত হয়।
সিলেটের আকাশ যোগাযোগ নিয়ে আলোচনায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলও এসেছে।
ভৌগোলিকভাবে সিলেট ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় ভবিষ্যতে গুয়াহাটিসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এ ধরনের রুট বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পর্যটন, চিকিৎসা, ব্যবসা এবং people-to-people connectivity বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
তবে এটিকে এখনই আসন্ন বা নিশ্চিত বিমান রুট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক রুট চালুর জন্য দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল ব্যবস্থা, ট্রাফিক রাইটস, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, এয়ারলাইনের আগ্রহ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা প্রয়োজন।
নতুন একটি অভ্যন্তরীণ রুট চালু করার ক্ষেত্রে উদ্বোধনী আগ্রহের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যাত্রী চাহিদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট–কক্সবাজার ফ্লাইটকে টেকসই করতে হলে এমন সময়সূচি প্রয়োজন হবে যাতে পর্যটকেরা দুই বা তিন দিনের ছোট ছুটিতেও সহজে যাতায়াত করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সঙ্গে সুবিধাজনক connection তৈরি করা গেলে প্রবাসী যাত্রীদেরও এ রুটে আকৃষ্ট করা সম্ভব।
এর পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, পর্যটন মৌসুম অনুযায়ী ফ্লাইটের সংখ্যা এবং স্থানীয় হোটেল-ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বিত প্যাকেজ রুটটির যাত্রী চাহিদা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগের বড় অংশ এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই যাত্রীদের ঢাকা হয়ে যেতে হয়।
সিলেট–কক্সবাজারের মতো point-to-point regional route সফল হলে অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহনে ঢাকানির্ভরতা কিছুটা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে সিলেটের প্রকৃতি ও চা-বাগানকেন্দ্রিক পর্যটনের সঙ্গে কক্সবাজারের সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটনকে একটি সফরে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তবে এখন পর্যন্ত সিলেট–কক্সবাজার ফ্লাইটের চূড়ান্ত উদ্বোধনের তারিখ, সাপ্তাহিক ফ্রিকোয়েন্সি কিংবা ভাড়া ঘোষণা করা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে রুটটি চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু নতুন একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট হবে না; বরং সিলেটের আন্তর্জাতিক যাত্রীপ্রবাহকে কক্সবাজারের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি tourism air corridor গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
মন্তব্য করুন