aviation
প্রকাশিত: 6 October 2026, 2:34:32 Pm
অনলাইন সংস্করণ

পাঁচ বছরে শাহজালাল বিমানবন্দরে জব্দ ২ হাজার কেজি স্বর্ণ

এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানে গত পাঁচ বছরে প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঢাকা কাস্টম হাউসের হিসাবে, জব্দ করা এসব স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে এসব স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণবার ও স্বর্ণালংকার থেকে সরকারের ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস।

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চোরাচালানকারীরা প্রতিনিয়ত কৌশল পরিবর্তন করলেও গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে একের পর এক চালান শনাক্ত করা হচ্ছে।

এক অর্থবছরেই জব্দ প্রায় ৬৯৭ কেজি

ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৯৭ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭০ কেজির বেশি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।

এই বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেই জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ১ হাজার ৯০৬ কেজির বেশি দাঁড়ায়। অন্যান্য অভিযানসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সামগ্রিক পরিমাণকে প্রায় ২ হাজার কেজি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পাল্টাচ্ছে কৌশল, বাড়ছে নজরদারি

স্বর্ণ চোরাচালানে ব্যবহৃত কৌশলও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীর শরীর ও লাগেজের পাশাপাশি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, বৈদ্যুতিক মোটর, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতল, জুতা, কোমরের বেল্ট, ওষুধের পাত্র এবং সাউন্ড বক্সের অ্যাডাপ্টারের মতো বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে স্বর্ণ লুকিয়ে আনার চেষ্টা শনাক্ত হয়েছে।

এমনকি উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ, কার্গো চালান এবং ফলের ক্যারেট ব্যবহার করেও স্বর্ণ আনার ঘটনা ধরা পড়েছে।

এসব কৌশল মোকাবিলায় যাত্রী, কার্গো ও বিমানবন্দরের বিভিন্ন অপারেশনাল এলাকায় ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিমানবন্দরকে চোরাচালানমুক্ত রাখার চেষ্টা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ জানিয়েছেন, বিমানবন্দরকে চোরাচালানমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থার কারণেই নিয়মিত স্বর্ণের চালান শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। চোরাচালান প্রতিরোধে ভবিষ্যতে নজরদারি আরও বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।

চলতি বছরেই কয়েকটি বড় চালান শনাক্ত

চলতি বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েকটি বড় স্বর্ণের চালান শনাক্ত হয়েছে।

গত ২৮ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেল থেকে প্রায় ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

এরপর ২ জুলাই বিমানের আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে প্রায় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া ১৯ জুলাই হংকং হয়ে আসা ক্যাথে প্যাসিফিকের একটি কার্গো ফ্লাইটে ফলের ক্যারেট থেকে প্রায় ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

বিমানবন্দরের বাইরেও অভিযান পরিচালিত হয়েছে। গত ১০ আগস্ট বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকায় একটি পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে প্রায় ১ কেজি ৮১২ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

এসব পৃথক ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট চোরাচালান চক্রের কার্যক্রম হিসেবে দেখার আগে তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

বাহকের পাশাপাশি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

এভিয়েশন ও আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দরে স্বর্ণ উদ্ধার এবং বাহক আটক চোরাচালান প্রতিরোধের একটি অংশ মাত্র। এর পেছনে অর্থায়নকারী, স্বর্ণের মালিক, সংগ্রহকারী এবং সম্ভাব্য দেশি-বিদেশি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে কাস্টমস, এভিয়েশন সিকিউরিটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত তদন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে বড় চালান কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং বিমানবন্দরের ভেতরে বা বাইরে কোনো সহযোগী ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা চোরাচালানের মূল নেটওয়ার্ক ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ।

বৈধ স্বর্ণ আমদানিতেও বড় রাজস্ব

চোরাচালান প্রতিরোধের পাশাপাশি বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা কাস্টম হাউসের হিসাবে, একই সময়ে বৈধভাবে আনা স্বর্ণবার ও অলংকার থেকে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে।

ফলে অবৈধ চালান শনাক্ত করা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের বিমান যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ও কার্গো চলাচলও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক যাত্রী ও কার্গো প্রোফাইলিং এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ঢাকা কাস্টম হাউস জানিয়েছে, স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা কার্যক্রম, নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে বৈধভাবে স্বর্ণ আনার ক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রচলিত শুল্ক ও ব্যাগেজ বিধি অনুসরণের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সূত্র: ঢাকা কাস্টম হাউস, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দ্রুত কার্গো খালাসে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এভিয়েশন খা

1

বেবিচক ও বিমান বাংলাদেশ: কাজের পরিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্

2

ইরানি ফ্লাইট বন্ধে সহযোগিতা করলে প্রতিবেশী দেশের বিমানবন্দর

3

আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও ‘বার্ড শুটার’ নির্ভর দেশের বিমানবন্দ

4

এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারে এয়ার অ্যাস্ট্রার বিশেষ অফার, টিকিটে ২

5

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে দুবাইফেরত যাত্রীর ব্যাগেজে প্রায় ৬ লাখ

6

শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালে আরও প্রয়োজন ৯০২ কোটি টাকা, যেসব

7

২০২৭ সালের মধ্যে লিজে আসছে ১০ উড়োজাহাজ, আন্তর্জাতিক রুট বাড়া

8

ব্রাজিলের দেশীয় ফল থেকে জেট জ্বালানি উৎপাদনে ৩ বিলিয়ন ডলার ব

9

রোমে আটকে পড়া বিমানের যাত্রীরা দুপুরে ফিরছেন দেশে

10

কী আছে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে

11

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় আবাসিক এলাকায় বিজনেস জেট বিধ্বস্ত,

12

ডিজিটাল রূপান্তরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল এয়ার ইন্ডিয়া

13

বাংলাদেশ-সৌদি বিমান চলাচল চুক্তি হালনাগাদে উদ্যোগ, বাড়তে পার

14

সৌদির সঙ্গে সপ্তাহে ২১ কার্গো ফ্লাইটের সুযোগ, ইউরোপেও পণ্য প

15

বেবিচকে ৮৯০ জন নিয়োগ: আবেদন শুরু ২৭ জুলাই, চলবে ১৬ আগস্ট পর্

16

শাহ আমানতে দুবাইফেরত যাত্রীর কাছ থেকে ১৫০০ গ্রাম স্বর্ণের পে

17

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ লাখ

18

অক্টোবরে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ১৬ ডিসেম্বরে সীমি

19

ডিসেম্বরে চালুর লক্ষ্যে থার্ড টার্মিনালের প্রস্তুতি জোরদার,

20