এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে বিশ্বখ্যাত নাজকা লাইনস (Nazca Lines) আকাশ থেকে দেখানোর সময় একটি ছোট পর্যটকবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১১ জন পর্যটক এবং দুজন পাইলট রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় সময় শনিবার সকালে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নাজকা লাইনস ঘিরে পরিচালিত একটি দর্শনীয় ফ্লাইটের সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। বেসরকারি বিমান সংস্থা এরোডায়না (Aerodiana) ফ্লাইটটি পরিচালনা করছিল।
বিমানটিতে থাকা কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি পিসকো বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কয়েক মিনিট পর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বিমানটির সন্ধানে তৎপরতা শুরু হয়। পরে নাজকা শহরের কাছে পুয়েবলো ভিয়েখো এলাকায় এর ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে বিমানটিতে থাকা ১১ পর্যটক ও দুই পাইলটের কাউকেই জীবিত উদ্ধার করা যায়নি।
নিহত পর্যটকদের জাতীয়তা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিমানটি কী কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পেরুর ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGAC) দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে।
তদন্তে উড়োজাহাজটির কারিগরি ও যান্ত্রিক অবস্থা, ফ্লাইট পরিচালনা, পাইলট-সংক্রান্ত বিষয় এবং দুর্ঘটনার সময়কার আবহাওয়াসহ বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে যান্ত্রিক ত্রুটি, মানবিক ভুল কিংবা আবহাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট কারণকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়নি।
বিমান দুর্ঘটনার তদন্তে সাধারণত উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস, পাইলটের অভিজ্ঞতা, ফ্লাইটপথ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দুর্ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্য পর্যালোচনার পরই দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
দুর্ঘটনার তদন্তে নাজকা অঞ্চলের আবহাওয়া পরিস্থিতিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় আবহাওয়া কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগের দিন অঞ্চলটিতে দমকা হাওয়া, কুয়াশা ও ধুলিঝড়ের কারণে দৃশ্যমানতা কমে গিয়েছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি দর্শনীয় ফ্লাইট বাতিলও করা হয়েছিল।
শনিবার দুর্ঘটনার সময় আবহাওয়ার অবস্থা কেমন ছিল এবং আগের দিনের প্রতিকূল পরিস্থিতির কোনো প্রভাব ফ্লাইটটির ওপর পড়েছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে বৈরী আবহাওয়াই দুর্ঘটনার কারণ—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পেরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ নাজকা লাইনস। মরুভূমির বিশাল এলাকাজুড়ে তৈরি এসব প্রাচীন জিওগ্লিফে বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ এবং জ্যামিতিক নকশার বিশাল অবয়ব রয়েছে।
ভূমি থেকে এসব নকশার পূর্ণ অবয়ব বোঝা কঠিন। আকাশ থেকে দেখলে বিশাল আকৃতির নকশাগুলো সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এ কারণেই নাজকা লাইনসকে কেন্দ্র করে ছোট উড়োজাহাজে দর্শনীয় ফ্লাইট পর্যটকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক পর্যটক এই ধরনের ফ্লাইটে অংশ নেন। সাধারণ যাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে এসব উড়োজাহাজ মূলত নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকা ঘুরে আকাশ থেকে দর্শনীয় স্থান দেখিয়ে আবার বিমানবন্দরে ফিরে আসে।
সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের তুলনায় এ ধরনের ছোট উড়োজাহাজের অপারেশন ভিন্ন ধরনের। পর্যটকদের নির্দিষ্ট স্থানের ভালো দৃশ্য দেখানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত এলাকার ওপর বিশেষ ফ্লাইটপথ অনুসরণ করতে হয়।
এ ধরনের অপারেশনে উড়োজাহাজের কারিগরি সক্ষমতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পাইলটের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান।
একই সঙ্গে কোনো পর্যটন এলাকায় একাধিক ছোট উড়োজাহাজ নিয়মিত চলাচল করলে এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৩ জনের প্রাণহানির এই দুর্ঘটনার পর নাজকা লাইনস ঘিরে পরিচালিত পর্যটকবাহী ছোট বিমানের নিরাপত্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। DGAC-এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণের পাশাপাশি এ ধরনের দর্শনীয় ফ্লাইট পরিচালনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা নতুন কোনো সুপারিশ প্রয়োজন কি না, সে বিষয়েও আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সূত্র: পেরুর স্থানীয় প্রশাসন ও DGAC
মন্তব্য করুন