এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দেশের পর্যটন খাতকে পরিকল্পিত ও টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে নতুন রোডম্যাপ তৈরি করছে সরকার। এর আওতায় জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন, দেশের ৬৪ জেলায় সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য চিহ্নিতকরণ এবং পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক অবদান নির্ধারণে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজম নীতিমালা প্রণয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আয়োজিত ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজমবিষয়ক এক সেমিনারে সরকারের এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি জানান, সরকার জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়নের কাজ করছে। দেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর উন্নয়নে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জানিয়েছেন, দেশের পর্যটন উন্নয়নকে শুধু প্রচলিত কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। বরং দেশের ৬৪ জেলার সম্ভাবনাময় পর্যটন স্থানগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় পর্যটন স্থানগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সরকার কাজ করতে চায়।
বাংলাদেশকে একটি পর্যটন হাবে রূপান্তর করা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ উল্লেখ করে তিনি এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দেন।
পর্যটন খাতের উন্নয়নে সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন করছে সরকার।
এ নীতিমালার মাধ্যমে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, গন্তব্য ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে সমন্বয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যটন খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, পর্যটন খাতের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতি ছয় মাসে জাতীয় পর্যটন পরিষদের সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যটন খাতকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পর্যটনসেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, দক্ষ জনবল, পর্যটকবান্ধব পরিবেশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের কার্যকর অংশগ্রহণ।
দেশের পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নির্ধারণে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) তৈরির কাজও শুরু করেছে সরকার।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার জানিয়েছেন, পর্যটন খাতের তথ্যের দীর্ঘদিনের ঘাটতি দূর করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট হলো পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিমাপের একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক কাঠামো। এর মাধ্যমে পর্যটকদের ব্যয়, পর্যটনসংশ্লিষ্ট উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এ তথ্য ভবিষ্যতে পর্যটন নীতি প্রণয়ন, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটন উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে গ্রামভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে চায় সরকার।
‘এসডিজি ভিলেজ’ উদ্যোগের আওতায় রাঙামাটির মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার পানখালী এবং দিনাজপুরের নাফানগরের মতো এলাকায় পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় আবাসন, খাবার, হস্তশিল্প, ট্যুর গাইড, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে ইকো-ট্যুরিজম নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার একটি পরিকল্পিত কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে টাঙ্গুয়ার হাওর উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে এ অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী, খাল, হাওর ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজম সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সরকার।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামিমুজ্জামান এ ধরনের পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারের নতুন উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য হলো বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলা।
এতে নীতিমালা, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে নীতিমালা চূড়ান্ত করা, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বহুমুখী সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সভা ও সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য।
মন্তব্য করুন