এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
প্রায় তিন দশক ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা বাগেরহাটের খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্প ঘিরে আবারও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান China National Machinery Import & Export Corporation (CMC)। একই সময়ে আবুধাবিভিত্তিক Equiline Finance বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবহন, পর্যটনসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকার খাতে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণে CMC আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে চারটি সম্ভাব্য বাস্তবায়ন মডেলের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে Equiline Finance-এর বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিকল্পনায় পরিবহন, বন্দর ও লজিস্টিকস এবং পর্যটনের মতো খাত রয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেওয়ার আগে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, অর্থায়নের কাঠামো এবং সরকারি অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
বাগেরহাটের রামপালের ফয়লা এলাকায় খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৯৬ সালে। ২৭ জানুয়ারি ১৯৯৬ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
শুরুতে প্রায় ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ এবং কিছু মাটি ভরাটের কাজ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর নির্মাণ আর এগোয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের জন্য আরও জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামোগত কিছু কাজ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ফলে প্রায় তিন দশক ধরে আলোচনায় থাকা বিমানবন্দরটি এখনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত CMC-এর একটি প্রতিনিধিদল গত ২৫ জুলাই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। এরপর ৩০ জুলাই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে বিমানবন্দরটি নির্মাণে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
CMC চার ধরনের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে Government-to-Government (G2G) ঋণ, Public-Private Partnership (PPP), Build-Operate-Transfer (BOT) এবং নির্মাণের সঙ্গে অর্থায়ন যুক্ত একটি সমন্বিত মডেল। কোন কাঠামো সবচেয়ে উপযোগী হবে, তা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
BOT পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দর নির্মাণের পর নির্ধারিত সময় পরিচালনা করে সেটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। অন্যদিকে অর্থায়নসহ নির্মাণ মডেল গ্রহণ করা হলে প্রকল্পের অর্থের উৎস ও নির্মাণকাজ একই কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ থাকে।
আবুধাবিভিত্তিক প্রকল্প অর্থায়ন ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান Equiline Finance বাংলাদেশে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি প্রাথমিক বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি Prime Bank Investment PLC-এর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকও সই করেছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে জ্বালানি, পরিবহন, স্বাস্থ্য, বন্দর ও লজিস্টিকস, কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, পর্যটন এবং ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে এই ২০০ কোটি ডলারকে শুধু খানজাহান আলী বিমানবন্দরের নির্মাণ ব্যয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি বাংলাদেশে বিভিন্ন অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়ে Equiline Finance-এর বৃহত্তর সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ।
খানজাহান আলী বিমানবন্দরের অবস্থান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায়। খুলনা ও বাগেরহাটের পাশাপাশি কাছেই রয়েছে মোংলা সমুদ্রবন্দর, মোংলা ইপিজেড এবং সুন্দরবন।
বিমানবন্দরটি চালু হলে এই অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত বিমান যোগাযোগ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসা, শিল্প ও পর্যটনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সময়-সংবেদনশীল ও উচ্চমূল্যের পণ্য পরিবহনে ভবিষ্যতে এয়ার কার্গো সক্ষমতা তৈরি করা গেলে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে বিমান যোগাযোগ যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক দেশি-বিদেশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে যাত্রী ও কার্গোর সম্ভাব্য চাহিদা, এয়ারলাইনগুলোর বাণিজ্যিক আগ্রহ, সড়ক যোগাযোগ এবং বিমানবন্দর পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দীর্ঘদিন স্থবির থাকা প্রকল্পটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এখনই বিমানবন্দর নির্মাণ নিশ্চিত হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
CMC-এর প্রস্তাব এখনো বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনার পর্যায়ে। একইভাবে Equiline Finance-এর ২০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ পরিকল্পনাও বাংলাদেশের একাধিক অগ্রাধিকার খাতকে ঘিরে।
খানজাহান আলী বিমানবন্দরকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে হলে হালনাগাদ সম্ভাব্যতা যাচাই, সম্ভাব্য যাত্রী ও কার্গো চাহিদা নিরূপণ, প্রকল্প ব্যয়, অর্থায়নের শর্ত, পরিবেশগত প্রভাব, বিনিয়োগ কাঠামো এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
তবে তিন দশক ধরে অপেক্ষমাণ প্রকল্পটিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নতুন আগ্রহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর নির্মাণের আলোচনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রস্তাবগুলো কার্যকর বিনিয়োগ ও নির্মাণ পরিকল্পনায় রূপ নিলে খানজাহান আলী বিমানবন্দর মোংলা বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ যুক্ত করে এ অঞ্চলের পরিবহন অবকাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সূত্র: বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
মন্তব্য করুন