বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহনের চাহিদা বাড়ছে। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ক্ষেত্রেই আগের বছরের তুলনায় ফ্লাইটের সংখ্যা কিছুটা কমলেও যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি ও দেশীয় এয়ারলাইনসের কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক গন্তব্যের বিস্তার বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজারের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৪টি বিদেশি যাত্রীবাহী এয়ারলাইনস, ৭টি কার্গো এয়ারলাইনস এবং ৪টি দেশীয় এয়ারলাইনস নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলো সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করছে ১৭টি দেশের ২৫টি গন্তব্যে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছিল ৬৬ হাজার ৬৭৫টি। ২০২৫ সালে তা কমে ৬৫ হাজার ৫৭৯টিতে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক বছরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কমেছে ১ হাজার ৯৬টি বা প্রায় ১.৬৪ শতাংশ।
কিন্তু একই সময়ে আন্তর্জাতিক যাত্রীর চিত্র ঠিক উল্টো।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পথে যাত্রী ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৫ হাজার ৬৯০ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক বছরে আন্তর্জাতিক যাত্রী বেড়েছে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৮৫ জন বা প্রায় ৫.২ শতাংশ।
এই দুই পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দেখা যায়—ফ্লাইটের সংখ্যা সামান্য কমলেও প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে পরিবহন করা যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে।
প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে Aviation Barta-এর হিসাবে, ২০২৪ সালে প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে গড়ে প্রায় ১৮০ জন যাত্রী ছিল। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে প্রায় ১৯৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
তবে এটি মোট যাত্রীসংখ্যাকে মোট ফ্লাইটসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া একটি সাধারণ সূচক; এটিকে নির্দিষ্ট এয়ারলাইনের প্রকৃত passenger load factor হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহনেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছিল ৯৭ হাজার ৮৮৭টি, যা ২০২৫ সালে কমে ৯৬ হাজার ৮৮৯টিতে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রায় ৯৯৮টি ফ্লাইট কমেছে।
অন্যদিকে যাত্রী কমেনি। ২০২৪ সালের ৪৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৬ জন থেকে ২০২৫ সালে অভ্যন্তরীণ যাত্রী বেড়ে হয়েছে ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ২৭৮ জন।
অর্থাৎ এক বছরে অভ্যন্তরীণ যাত্রী বেড়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার ৭০২ জন বা প্রায় ৬ শতাংশ।
এখানেও ফ্লাইটের তুলনায় যাত্রী বৃদ্ধির হার বেশি। সাধারণ হিসাবে প্রতি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রীর সংখ্যা ২০২৪ সালের প্রায় ৪৮ জন থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৫১ জনে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যাত্রীর তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়।
২০২৪ সালে দুই খাত মিলিয়ে যাত্রী ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৭২ হাজার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ৭৩ হাজারে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ এক বছরে মোট যাত্রী বেড়েছে প্রায় ৯ লাখ।
এদিকে ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী বিমান ভ্রমণের চাহিদাও শক্তিশালী ছিল। IATA-এর হিসাবে ওই বছর বৈশ্বিক যাত্রী চাহিদা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বাংলাদেশের এয়ার কার্গো খাতেও গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে।
২০২৩ সালে দেশে এয়ার কার্গো পরিবহনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৫ দশমিক ৪৬ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালে সেটি বেড়ে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক বছরেই কার্গো পরিবহন বেড়েছিল প্রায় ২৮.৮ শতাংশ।
২০২৫ সালে কার্গো পরিবহনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৪ দশমিক ৪৬ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালের তুলনায় এটি প্রায় ২.১ শতাংশ কম, তবে ২০২৩ সালের তুলনায় এখনও প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। মূল প্রকাশিত পরিসংখ্যানেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এই কার্গো পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।
এয়ার কার্গো বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্চমূল্যের ও সময়-সংবেদনশীল রপ্তানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে বিমান পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে ভারতের তৃতীয় দেশে পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশের এয়ার কার্গো সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও আলোচনায় আসে। CAAB ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তখন অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।
২০২৪ ও ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়।
প্রথমত, ফ্লাইটের সংখ্যা সামান্য কমলেও যাত্রী চাহিদা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন দেশের বিমানবাজারের বড় অংশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের বড় প্রবৃদ্ধির পর কিছুটা কমলেও এয়ার কার্গোর পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উঁচু রয়েছে।
বিশ্বব্যাপীও বিমান পরিবহনের চাহিদা বাড়ছে। Airports Council International (ACI) World-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে রেকর্ড ৯৮০ কোটি যাত্রী চলাচল করেছে এবং বৈশ্বিক এয়ার কার্গো ১৩ কোটি ১২ লাখ টনে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন বড় প্রশ্ন শুধু কতগুলো ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে তা নয়; বরং বাড়তে থাকা যাত্রী ও কার্গো চাহিদার সঙ্গে বিমানবন্দরের সক্ষমতা, সেবার মান, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, এয়ারলাইন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ কত দ্রুত সম্প্রসারণ করা যায়।
Aviation Barta Data Analysis: প্রকাশিত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি ও প্রতি-ফ্লাইট গড় হিসাব করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন