aviation
প্রকাশিত: 2 October 2026, 12:07:39 Am
অনলাইন সংস্করণ

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ১৭ ধরনের পণ্যে

এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক

একসময় স্বর্ণের বড় চালান উদ্ধারের ঘটনায় প্রায়ই আলোচনায় আসত চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তবে গত এক বছরে বদলে গেছে চোরাচালানের চিত্র। এখন বিমানবন্দরটিতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনার চেষ্টা করা পণ্যের তালিকায় সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে বিদেশি সিগারেট। পাশাপাশি বাড়ছে কসমেটিকস, ই-সিগারেট, ভ্যাপ ও উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য আনার প্রবণতা।

বিমানবন্দর কাস্টমসের সাম্প্রতিক জব্দের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের লাগেজ তল্লাশি করে সাড়ে ২৪ হাজার কার্টনের বেশি বিদেশি সিগারেট, ৮ হাজার ৭৫৬ পিস বিভিন্ন ধরনের বিউটি ক্রিম ও সিরাম এবং ২৩৭ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে।

বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী যাত্রীদের ব্যাগেজ সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বাণিজ্যিক পরিমাণে পণ্য আনার চেষ্টা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ প্রবাসীদেরও বিভিন্ন পণ্য বহনের জন্য ব্যবহার করছে চোরাকারবারি চক্র।

পাঁচ আন্তর্জাতিক রুটে বিশেষ নজরদারি

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক একাধিক আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট চলাচল করছে। বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে অন্তত পাঁচটি রুট ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে চোরাই সিগারেট আনার চেষ্টা নজরে এসেছে।

বিশেষ করে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটগুলোতে এ ধরনের পণ্য পাওয়ার ঘটনা বেশি নজরে আসায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নজরদারি জোরদার করেছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরেই এ ধরনের প্রবণতা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসার পর কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা ও এভিয়েশন সিকিউরিটির সমন্বয়ে বিশেষ নজরদারি শুরু করা হয়েছে।

কেন সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে চোরাকারবারিরা

কাস্টমস-সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি সিগারেটের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক থাকায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে এনে বিক্রি করতে পারলে বড় অঙ্কের মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়।

কাস্টমস গোয়েন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে প্রায় ২০ টাকা দামের একটি সিগারেট শলাকার বিপরীতে শুল্কের অংশ প্রায় ১৭ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে বাণিজ্যিক পরিমাণে শুল্ক না দিয়ে সিগারেট দেশে প্রবেশ করাতে পারলে একটি চালান থেকেই উল্লেখযোগ্য অবৈধ মুনাফার সুযোগ থাকে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, স্বর্ণ চোরাচালানের ক্ষেত্রে আইনি ঝুঁকি ও শাস্তির মাত্রা বেশি হওয়ায় কিছু চক্র তুলনামূলকভাবে সহজে বহনযোগ্য এবং বাজারে দ্রুত বিক্রি করা যায়—এমন পণ্যের দিকে ঝুঁকছে।

তবে কোনো অপরাধে আইনি ঝুঁকি বা শাস্তির প্রকৃতি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইন, পণ্যের ধরন, পরিমাণ ও ঘটনার পরিস্থিতির ওপর।

নজরে অন্তত ১৭ ধরনের পণ্য

বিমানবন্দর সূত্র বলছে, বর্তমানে অন্তত ১৭ ধরনের পণ্য শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনার চেষ্টা শনাক্ত করা হচ্ছে।

এর মধ্যে বিদেশি সিগারেটের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ই-সিগারেট ও ভ্যাপ, মদ ও মদজাত দ্রব্য, ল্যাপটপ, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য, বিউটি ক্রিম ও হোয়াইটেনিং সিরাম, ফার্স্ট এইড বক্স, সার্ভার, হুক্কা, পিসিবি ও টেলিভিশনসহ বিভিন্ন উচ্চ শুল্কের পণ্য রয়েছে।

পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি জব্দের ঘটনা দেখা যাচ্ছে সিগারেট ও কসমেটিকসের ক্ষেত্রে।

ছয় মাসে ৮ হাজার ৭৫৬ পিস ক্রিম-সিরাম জব্দ

সিগারেটের পাশাপাশি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস ও রূপচর্চার সামগ্রী আনার প্রবণতাও বেড়েছে।

কাস্টমসের হিসাবে, গত ছয় মাসে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৮ হাজার ৭৫৬ পিস বিউটি ক্রিম, গৌরি ক্রিম ও হোয়াইটেনিং সিরাম জব্দ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ হাজার ৬৪৯ পিস বিউটি ক্রিম এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৮১ পিস বিউটি ও গৌরি ক্রিম জব্দ হয়। ফেব্রুয়ারিতে জব্দ করা হয় ২ হাজার ২১৪ পিস বিউটি ক্রিম।

মার্চে ৯২২ পিস বিউটি ক্রিম ও ১৮ পিস গৌরি ক্রিম আটক করা হয়। এপ্রিলে জব্দ হয় ৬৫২ পিস বিউটি ক্রিম, ২০৯ পিস গৌরি ক্রিম ও ১৩৮ পিস হোয়াইটেনিং সিরাম। আর মে মাসে একটি চালান থেকেই ২ হাজার ৭৫১ পিস বিউটি ক্রিম জব্দ করে কাস্টমস।

ই-সিগারেট, ভ্যাপ ও বিদেশি মদও আসছে লাগেজে

কাস্টমসের নজরদারিতে সাধারণ সিগারেটের পাশাপাশি ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হুক্কা, গুটখা ও জর্দার মতো পণ্যও ধরা পড়ছে।

গত ডিসেম্বরে একবারেই ৩১১ পিস ই-সিগারেট জব্দ করা হয়। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ই-সিগারেটের যন্ত্রাংশ, ভ্যাপ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত পণ্যের চালানও আটক হয়েছে।

একই ছয় মাসে শুল্ক ও অন্যান্য প্রযোজ্য বিধি এড়িয়ে আনার চেষ্টার সময় মোট ২৩৭ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করেছে কাস্টমস।

কমেছে স্বর্ণ জব্দের ঘটনা

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অতীতে বড় স্বর্ণের চালান উদ্ধারের ঘটনা নিয়মিত আলোচনায় এলেও সর্বশেষ ছয় মাসের কাস্টমস পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে ২২ দশমিক ১৯ গ্রাম এবং জানুয়ারিতে কাস্টমস ইউনিটের মাধ্যমে ১১১ গ্রাম ও এয়ারফ্রেইট ইউনিটের মাধ্যমে ৭১ গ্রাম স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ২০ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯০ টাকা।

ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসের জব্দ তালিকায় কোনো স্বর্ণের উল্লেখ নেই।

তবে নির্দিষ্ট সময়ে স্বর্ণ জব্দের ঘটনা কমে যাওয়াকে স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কেবল ওই সময়কালে কাস্টমসের জব্দের পরিসংখ্যানের চিত্র।

প্রবাসীদের লাগেজকে ব্যবহার করছে চক্র

বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টদের জন্য উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হচ্ছে সাধারণ প্রবাসী যাত্রীদের ব্যবহার করে বাণিজ্যিক পণ্য আনার চেষ্টা।

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা এবং এভিয়েশন সিকিউরিটি যৌথভাবে কাজ করায় সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধভাবে আনা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য কাস্টমস হলে আটক হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ প্রবাসীরা না বুঝেই চোরাকারবারি চক্রের ফাঁদে পড়ে নিজেদের লাগেজে অন্যের দেওয়া বাণিজ্যিক পণ্য বহন করেন। অথচ এসব পণ্য বহনের দায় শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট যাত্রীর ওপরও আসতে পারে।

এ কারণে বিদেশ থেকে ফেরার সময় পরিচিত বা অপরিচিত কারও দেওয়া প্যাকেট, ব্যাগ কিংবা ভেতরের উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত নন—এমন কোনো পণ্য বহন না করার বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে’ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর জানিয়েছেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য প্রবেশ ও মুদ্রা পাচার ঠেকাতে কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো অনিয়ম প্রতিরোধে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চোরাচালান প্রতিরোধ শুধু রাজস্ব সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি এভিয়েশন নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাত্রীর ব্যাগেজ ব্যবহার করে অবৈধ বা অঘোষিত পণ্য পরিবহনের প্রবণতা বাড়লে নিরাপত্তা তল্লাশি ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।

বিশেষ করে প্রবাসী যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—অন্য কারও অনুরোধে এমন কোনো ব্যাগ, প্যাকেট বা পণ্য বহন না করা, যার ভেতরে কী রয়েছে তা তারা নিজেরা নিশ্চিতভাবে জানেন না।

সূত্র: শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শাহজালাল বিমানবন্দরে কোটি টাকার বিদেশি সিগারেট, স্বর্ণ, নিষি

1

কর্মস্পৃহা বাড়াতে লাঞ্চ ভাতা চান বেবিচক কর্মকর্তারা

2

শাহজালালে স্ক্যানার অপারেটরদের রেডিয়েশন ঝুঁকি, নিরাপত্তা ব্য

3

জেদ্দা বিমানবন্দরে চালু টার্মিনাল-৪, ধাপে ধাপে স্থানান্তর হচ

4

সৌদির সঙ্গে বিমান যোগাযোগে নতুন মাইলফলক, সপ্তাহে ফ্লাইট বাড়ছ

5

বিমানের উড়োজাহাজে তেলাপোকা-ছারপোকার অভিযোগ, তদন্তের পর ৭ দফা

6

আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও ‘বার্ড শুটার’ নির্ভর দেশের বিমানবন্দ

7

জেদ্দায় বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা: রিয়াদ যাত্রীদ

8

ইউরোপের সঙ্গে বিমান চলাচলে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ, বহর

9

১২ অক্টোবর রাত ৩টা পর্যন্ত বন্ধ রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

10

বেবিচকের বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পদসংখ্যা প্রায় ৯০০; আবেদ

11

প্রায় এক দশক পর আকাশপথে ফিরছে রায়ানি এয়ার, লক্ষ্য হজ-ওমরাহ য

12

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্

13

শাহজালালের থার্ড টার্মিনালে বসছে অত্যাধুনিক ইনডোর টেলিকম নেট

14

যুক্তরাষ্ট্রে বিধ্বস্ত এফ-৩৫বি স্টেলথ যুদ্ধবিমান, ইজেক্ট করে

15

আগস্টে বৈশ্বিক এয়ার কার্গো চাহিদা বেড়েছে ৪.৪ শতাংশ: IATA

16

রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধে ৯টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত, ভোগান্তির মুখ

17

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, কারণ অনুসন্ধানে তদন

18

ঢাকা–রিয়াদ রুটে রিয়াদ এয়ারের সরাসরি ফ্লাইট চালু

19

হজের ব্যয় কমাতে সৌদি সরকারের সহযোগিতা চাইলেন বিমানমন্ত্রী

20